ডিজিটাল লেনদেনের যুগেও অর্থনীতিতে নগদের পাহাড় ॥ অর্থনীতিতে ঘুরছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকার ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট

Even in the era of digital transactions, there is a mountain of cash in the economy
বিশেষ প্রতিবেদক:- ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০৩ অপরাহ্ন অর্থনীতি
বিশেষ প্রতিবেদক:- ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০৩ অপরাহ্ন
ডিজিটাল লেনদেনের যুগেও অর্থনীতিতে নগদের পাহাড় ॥ অর্থনীতিতে ঘুরছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকার ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট
--সংগৃহীত ছবি

ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়লেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নগদের দাপট কমেনি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেশে প্রচলিত কাগুজে নোটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই আবার ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোটে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ডিজিটাল লেনদেনের যুগেও অর্থনীতিতে এত বিপুল নগদ কেন প্রয়োজন হচ্ছে?


বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৫ জুন ২০২৬-এর Statement of Affairs অনুযায়ী, ওই দিন Notes in Circulation বা প্রচলিত নোটের পরিমাণ ছিল ৩,৬৯২,৬৪৯,১৩৬,০০০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। একই দিনে Notes Issued-এর পরিমাণও প্রায় একই ছিল।


বড় নোটেই টাকার বড় অংশ:-

বাংলাদেশ ব্যাংকের Bangladesh Payment Systems Report 2025-এর ডিসেম্বরের মূল্যমানভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ৫০০ টাকার নোট ছিল প্রায় ২২৭ কোটি ৬৬ লাখটি। এসব নোটের মোট মূল্য প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ১ হাজার টাকার নোট ছিল প্রায় ১৬৩ কোটি ৪৪ লাখটি। এসব নোটের মোট মূল্য প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।

অর্থাৎ শুধু ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোটেই ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এই দুই মূল্যমানের নোটের অর্থমূল্যই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ওই মূল্যমানভিত্তিক হিসাবের সিংহভাগ।


ছোট নোটের সংখ্যা কম নয়:-

মূল্যমানভেদে নোটের সংখ্যায় অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ডিসেম্বর ২০২৫-এর হিসাবে ১০ টাকার নোট ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি ৮১ লাখ, ২০ টাকার নোট ৯৩ কোটি ৫৫ লাখ, ৫০ টাকার নোট ৬৪ কোটি ৫৭ লাখ এবং ১০০ টাকার নোট ১১৪ কোটি ৭৩ লাখট।২০০ টাকার নোট ছিল প্রায় ৩৯ কোটি ৬৫ লাখ।কিন্তু সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য হলেও ছোট মূল্যমানের নোটগুলোর মোট অর্থমূল্য বড় নোটের তুলনায় অনেক কম।


এক নজরে নোটের মূল্যমান প্রচলিত নোটের সংখ্যা আনুমানিক মোট মূল্য:-

১০ টাকা নোটের সংখা ১৪৮.৮১ কোটি-আনুমানিক মুল্য ১,৪৮৮ কোটি।

২০ টাকা নোটের সংখা ৯৩.৫৫ কোটি - আনুমানিক মুল্য

১,৮৭১ কোটি।

৫০ টাকা নোটের সংখা ৬৪.৫৭ কোটি- আনুমানিক মুল্য

৩,২২৮ কোটি।

১০০ টাকা নোটের সংখা ১১৪.৭৩ কোটি-আনুমানিক মুল্য

১১,৪৭৩ কোটি।

২০০ টাকা নোটের সংখা ৩৯.৬৫ কোটি-আনুমানিক মুল্য

৭,৯৩১ কোটি!

৫০০ টাকা নোটের সংখা ২২৭.৬৬ কোটি- আনুমানিক মুল্য

১,১৩,৮৩০ কোটি।

১,০০০ টাকা নোটের সংখা ১৬৩.৪৪ কোটি-আনুমানিক মুল্য ১,৬৩,৪৪৪ কোটি।


‘নোট ছাপানো’ আর ‘বাজারে থাকা’ এক নয়:-

নগদ অর্থ নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক যত নোট ইস্যু করে, তার সবগুলোকে ‘মানুষের হাতে থাকা টাকা’ বলা যায় না। 


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবের Notes in Circulation হলো প্রচলনে থাকা নোটের হিসাব। আবার ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবেও নগদ অর্থ থাকতে পারে।

তাই ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কত টাকা ছাপিয়েছে’ এবং ‘দেশে কত টাকার নোট প্রচলনে রয়েছে’—দুটি একই প্রশ্ন নয়।


এক বছরে নয়, কয়েক মাসেই বড় পরিবর্তন:-

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর Statement of Affairs-এ Notes in Circulation ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। ২৫ জুন ২০২৬-এ তা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা হয়েছে।

অর্থাৎ ওই দুই হিসাবের তারিখের ব্যবধানে প্রচলিত নোট বেড়েছে প্রায় ৬২ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা।


কেন বাড়ছে নগদের চাহিদা:-

অর্থনীতিতে নগদের চাহিদা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, নগদে সঞ্চয়ের প্রবণতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে লেনদেন—সবকিছুই এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে শুধু প্রচলিত নোটের পরিমাণ দেখে দেশের কত টাকা ‘ব্যাংকের বাইরে’ বা কত টাকা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ জন্য আমানত, ঋণ, মুদ্রার গতি, ডিজিটাল লেনদেন ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।


ডিজিটাল যুগেও নগদের আধিপত্য:-

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ড ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক মাধ্যমে লেনদেন বাড়লেও নগদ অর্থের প্রয়োজন পুরোপুরি কমেনি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশের অর্থনীতিতে এখনো কয়েক লাখ কোটি টাকার কাগুজে নোট সক্রিয়ভাবে প্রচলনে রয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—মোট অর্থমূল্যের বড় অংশ বহন করছে ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোট।

ফলে অর্থনীতির এই নগদ নির্ভরতার প্রকৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে—নগদের এই বিপুল চাহিদা কি কেবল লেনদেনের প্রয়োজন মেটাচ্ছে, নাকি অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদনির্ভর অবস্থায় রয়েছে?