সুরশুনিপাড়া মিশনে যুব নেতাদের লাঠি হাতে ধাওয়া ধর্মীয় যাজকের, অর্থ তছরুপসহ একাধিক অভিযোগ
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাকনহাট পৌরসভার সুরশুনিপাড়া ধর্মপল্লীতে যুবকদের দিকে লাঠি হাতে তেড়ে আসার অভিযোগ উঠেছে ধর্মপল্লীর সহকারী পুরোহিত শেখর কস্তার বিরুদ্ধে। গত ২ সেপ্টেম্বর আনুমানিক সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ধর্মপল্লীর কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আদিবাসী খ্রিষ্টানদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদিবাসী যুব সমাজ (IYS) সংগঠনের সভাপতি মি. ডেভিড সরেন দীর্ঘদিন ধরে ধর্মপল্লীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও অন্যায়ের বিষয়ে কথা বলে আসছেন। এ কারণে তাঁকে মণ্ডলী থেকে বহিষ্কার এবং ধর্মীয় সাক্রামেন্ত গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিরোধের সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারির মিশনের বাৎসরিক পর্বের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই দিন যুবকদের উদ্যোগে ধর্মপল্লীর বার্ষিক পর্ব উদযাপন করা হয় । আয়োজনের শেষ পর্যায়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে সমাজের কিছুসংখ্যক মানুষ প্রশ্ন তোলেন, মিশনের পক্ষ থেকে প্রতি গ্রাম থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। যুবকদের উদ্যোগে সমস্ত ব্যয় বহন করে পর্ব আয়োজন করা হয়। কিন্তু গ্রাম থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা তুলে কোথায় ব্যয় হয়েছে এবং খরচের খাত কী—তা জানতে চান তাঁরা।
এ নিয়ে একপর্যায়ে সেখানে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয় গুরুজন মি. রেনাতুস সরেনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তখন বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও যুব সংগঠনের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে যাজকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁদের বারবার নতুন তারিখ দেয়া হয় এবং সময়ক্ষেপণ করা হয়। ৮ মার্চ বিষয়টি সমাধানের জন্য আলোচনার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।নির্ধারিত দিনে যুবক ও অন্যান্য সদস্যরা সমাধানের আশায় যাজকের কাছে গেলে সেখানে সুরশুনিপাড়া মিশনের বাইরের ফাদার উইলিয়াম মুর্মু এবং ভিকার জেনারেল ফাদার ফাবিয়ান মার্ডিও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে সামাজিকভাবে সমাধান হওয়ার কথা থাকলেও ওই বৈঠকে মূল ঘটনার পরিবর্তে যুবকদের একতরফাভাবে দোষারোপ করে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। যুবকেরা এতে রাজি না হয়ে সেখান থেকে চলে আসেন।
আলোচনায় সমাধান না হওয়ায় মি. ডেভিড সরেন সেদিন রাতেই পুরো বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে যাজক ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ক্ষুব্ধ হন বলে জানান ভুক্তভোগী । এরপর মি. ডেভিড সরেনকে মন্ডলিবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। সংগঠনের সদস্যদের দাবি পরবর্তী সময়ে বিষয়টির সমাধানের কথা বলে মি. ডেভিড সরেনকে একা ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তারা তাঁকে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলেন। এমনকি লিখিতভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং সবার সামনে নিজের ভুল স্বীকার করার জন্যও তাঁকে চাপ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। মি. ডেভিড সরেনকে তার বাবা মাকে নিয়ে ডেভিড সরেনকে একা ডাকা হতো,কিন্তু তিনি একা যেতে রাজি ছিলেন না।
গত ২ সেপ্টেম্বর বুধবার মি. ডেভিড সরেন তাঁর সংগঠনের আরও চার সদস্য—হিলারিউস টুডু, নিকোলাস হাঁসদা, রিপন ও প্রশান্তকে সঙ্গে নিয়ে ধর্মপল্লীতে যান। তাঁরা ফাদার প্রদীপ কস্তাকে ফোন করে আলোচনার বিষয়ে কথা বলেন।
পরে ফাদার প্রদীপ কস্তা অফিসে এসে আলোচনা শুরু করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আলোচনা চলাকালে সমস্যার সমাধান না করে যাজক প্রদীপ কস্তা উত্তেজিত হয়ে উঠে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন সংগঠনের যুবকেরা তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। এ সময় ফাদার প্রদীপ কস্তা মি. ডেভিড সরেনকে একা আসতে বলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ডেভিড একা সাক্ষাতে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে তাঁকে বাবা-মাকে নিয়ে আসতে বলা হয়। তখন ডেভিড প্রশ্ন করেন, তাঁর দোষ কী এবং তাঁর কারণে তাঁর পরিবারকে কেন ডাকা হবে। জনগন নিয়ে সমস্যা হয়েছে জনগণের সামনে সমাধান করতে হবে। সেই সময় ফাদার প্রদীপ কস্তা সমাধান ও উত্তর না দিয়ে অফিস থেকে চলে যেতে চাইলে যুবকেরা বাঁধা দিলে সহকারী পুরোহিত ফাদার শেখর কস্তা লাঠি হাতে যুবকদের দিকে তেড়ে আসেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁকে বাধা দিতে IYS-এর সাংগঠনিক সম্পাদক হিলারিউস টুডু সামনে দাঁড়ালে তাঁর দিকেও লাঠি তোলা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২ সেপ্টেম্বরের বৈঠকটি মূলত দীর্ঘদিনের বিরোধের সমাধানের জন্যই করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।
এরপর মি. ডেভিড সরেনকে মণ্ডলীর বিরুদ্ধে কথা বলছেন—এমন একটি ট্যাগ দেওয়া হয় এবং তাঁকে সাক্রামেন্ত থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি যাজক ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কারণে বড় আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় আদিবাসী খ্রিষ্টানদের অভিযোগ, সুরশুনিপাড়া ধর্মপল্লীর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মণ্ডলী পরিচালনা এবং সাধারণ সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, বাঙালি যাজকদের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁরা মিশনের নীতিনির্ধারক হয়ে আদিবাসী খ্রিষ্টানদের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালিয়ে আসছেন।
স্থানীয়রা বলেন এর আগে নওগাঁর ধামইরহাট মিশনে যাজক প্রদীপ গ্রেগরীর বিরুদ্ধে এক কিশোরীকে নির্যাতনের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে তানোরের মুন্ডুমালায় এক আদিবাসী কিশোরীকে তিন দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগের কথাও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুরশুনিপাড়ায় এক আদিবাসী যুবকের দিকে লাঠি হাতে তেড়ে আসা ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগের বিষয়টিও তাঁরা সামনে এনে বলেন এসবই বাঙালি যাজকেরা করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি সুরশুনিপাড়া ধর্মপল্লীর প্রধান পালপুরোহিত প্রদীপ যোসেফ কস্তার নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, এলাকাবাসীর বক্তব্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মতবিরোধ বা কোনো অভিযোগ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। কোনো পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ বা হামলা করা কোনোভাবেই সমাধানের পথ হতে পারে না।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বাঙালি যাজকেরা এভাবে বিভিন্ন সময় মানুষকে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রাখেন অভিযোগ রয়েছে ভূমিহীন, দরিদ্র ও অসহায় আদিবাসীদের ধর্মীয় ও সামাজিক নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তারের ঘটনা রয়েছে। প্রতিবাদ করলে সামাজিকভাবে এবং মান্ডলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা, পরিবার বা বসতবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া,আদিবাসী খ্রীস্টান সাঁওতাল মাহালি ও অন্যান্য আদিবাসী সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করে, জাতিগত সংস্কৃতি পালনে সংকুচিত করা কিংবা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ আছে।
সুরশুনিপাড়া ধর্মপল্লীর সাম্প্রতিক ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ও এলাকাবাসী।তাঁদের দাবি, ধর্মপল্লীর আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।মণ্ডলীর কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বা ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার কারণ স্পষ্ট করতে হবে এবং তা রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রচলিত বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় নেতা রাষ্ট্রীয় আইনের ঊর্ধ্বে নন। কারও বিরুদ্ধে শারীরিক আক্রমণ, বেআইনিভাবে আটকে অবরুদ্ধ রাখা,নিগ্রীহিত করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জবরদস্তির অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে নাগরিকের অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ আরও শক্তিশালী হবে।