জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ ন্যায়বিচার নিশ্চিতে রাজশাহীর বারাহী, নবগঙ্গা ও বারনই নদীর দূষণ বন্ধের দাবি
রাজশাহীর পদ্মা থেকে উৎসারিত নবগঙ্গা, বারাহী, স্বরমঙ্গলা নদী ও বারনই নদী দখল দূষন বন্ধসহ কতিপয় দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় নওহাটা ব্রীজ এলাকায় বারনই নদীপাড়ে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন নবগঙ্গা, বারাহী ও বারনই নদীপাড়ের মানুষ, জেলে, মৎস্যজীবী, নদী গবেষক, সামাজিক আন্দোলনকর্মী, পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বরেন্দ্র অঞ্চলের যুব, পরিবেশবাদী, সেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের বৃহৎ ঐক্য বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, গ্রিন কোয়ালিশন, নওহাটা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ও উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) যৌথভাবে এই কর্মসূচীর আয়োজন করে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, রাজশাহী নগরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য (মেডিকেল বর্জ্যসহ) স্বরমঙ্গলা নদী, বারাহী নদী, নবগঙ্গা নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। নগরের বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য নিম্নাঞ্চলে জমা হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করছে সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিল ও কর্ণহার বিল। হাজার হাজার হেক্টর এসব বিল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক বাস্তুন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, দূষিত পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, জলজ উদ্ভিদ ও মাছের উৎপাদন কমে গেছে এবং বিলের পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে। এই দূষিত পানি দিয়ে চাষাবাদ চলতে থাকায় মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং ফসলে ভারীধাতুসহ ক্ষতিকর উপাদান জমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ ও দুর্গন্ধজনিত শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্যজীবী ও কৃষকসহ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী দূষণের সরাসরি প্রভাব বহন করছে, যা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্নও উত্থাপন করছে। এই পরিস্থিতি কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের প্রশ্ন। দূষিত পানির নিম্নপ্রবাহ আত্রাই নদী হয়ে নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্বক হুমকি।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, গঙ্গা/পদ্মা থেকে উৎসারিত এই নদীগুলো একসময় ছিল স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বর্তমানে এসব নদীর পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে, তলদেশে পলি ও প্লাস্টিক জমে প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে এবং মাছসহ জলজ প্রাণের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয় জেলেরা আয় হারাচ্ছেন এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশগত চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। রাজশাহীতে অবিলম্বেই কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
নদীপাড়ের বাসিন্দা শ্রীমতি সুভদ্রা রানী হালদার বলেন- “এই নদীর পানি গায়ে ঠেকলেই সেখানে নানা রকম চর্মরোগ হয়। তিনি তার হাতের ঘা দেখিয়ে বলেন, “এই পানিতে নামার ফলে হাতে ঘা হয়ে গেছে অনেকদিন হচ্ছে কিন্তু সেরে যাচ্ছে না। এখন ঔষধ দিলে একটু আরাম পাওয়া যায় তাছাড়া জ্বালা করে।”
নওহাটা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৎস্যজীবী আবু সামা বলেন, “দীর্ঘদীন ধরেই আমরা শহরের এই দূষিত পানির কথা বলে আসতেছি কিন্তু এখনো কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। আমরা নদীপাড়ের মানুষ আমরা এই সমস্যার সমাধান চাই।”
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো, আতিকুর রহমান বলেন, “কোন রকম বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই নগরীর তরল দূষিত বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য, কলকারখানার বর্জ্য বিভিন্ন ড্রেনের মাধ্যমে বারাহী ও নবগঙ্গা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বারনই নদীতে পড়ছে। ফলে এই নদীগুলোতে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এখানকার মাছ ও জলজবাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই দূষিত পানি বিভিন্ন বিলের কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে ফলে কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন মারাত্বক হুমকির মুখে পড়ছে। অবিলম্বেই রাজশাহীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
পবা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “নওহাটা পৌরসভার বর্জ্য সরাসরি এই নদীতে ফেলা হচ্ছে। এভাবে রাজশাহীর বিভিন্ন পৌরসভার বর্জ্যও সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। এগুলো বন্ধ করতে হবে। মনিটরিং ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে এবং কমিউনিটি ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”
নওহাটার দেবেন হালদার বলেন, “আমরা আমাদের জীবীকা ফেরত চাই। মাছ ধরেই আমাদের জীবন চলে কিন্তু এই দূষণের ফলে আজ নদীতে মাছ নেই।”
গ্রিন কোয়ালিশন পবা উপজেলার সভাপতি রহিমা খাতুন মানববন্ধন থেকে ৬ দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো- পদ্মা থেকে উৎসারিত স্বরমঙ্গলা নদী, বারাহী নদী, নবগঙ্গা এবং বারনই নদীগুলোর সিমানা চিহ্নিত করে অবিলম্বে দখল-দূষণমুক্ত করতে হবে; রাজশাহী নগরের তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে আধুনিক “সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ঝঞচ)”, “ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ঊঞচ)” স্থাপন ও কার্যকর করতে হবে; সকল শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ঊঞচ) নিশ্চিত ও কমিউনিটি ভিত্তিক কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দূষণকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; বারনই, বারাহী ও নবগঙ্গা নদীসহ পদ্মা থেকে উৎসারিত অন্যান্য নদী ও সংযোগ বিলসমূহে সরাসরি অপরিশোধিত বর্জ্যবাহী ড্রেন সংযোগ, দখল-দূষণ বন্ধ করতে হবে। দখল-দূষণের উৎস শনাক্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। পোল্ট্রি খামারগুলোকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে; সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিলসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিল ও নদীর পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; নদ-নদী-বিল, পুকুর-জলাশয়-জলাধার দখল ও ভরাট বন্ধ করতে হবে এবং সমন্বিত পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান স্থানীয় জনগোষ্ঠী, তরুন-যুব, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
মানববন্ধনের পরে দুপুরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি মাননীয় প্রদানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্মারকলিপি গ্রহন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী এবং বিভাগীয় কমিশনারের পক্ষে স্মারকলিপি গ্রহন করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (শিক্ষা ও আইসিটি) ড. চিত্রলেখা নাজনীন। স্মারকলিপির অনুলিপি পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব বরাবর এবং রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এর প্রশাসক, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রেরণ করা হয়েছে।
মানব বন্ধনে আরো বক্তব্য রাখেন, সামাজিক আন্দোলনকর্মী মাহমুদ জামাল কাদেরী, সামাজিক কল্যাণ সংস্থার রির্বাহী পরিচালক সম্রাট রায়হান, দুয়ারি হলদার পাড়ার জেলে মহির উদ্দিন, বাগধানী হলদার পাড়ার জেলে ইনতাজ আলী, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পলি রানীসহ প্রমূখ।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা, চরমভাবাপন্ন রাজশাহীর পরিবেশ, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, ও প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় অবিলম্বে উত্থাপিত জনদাবীসমূহ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জোর দাবি জানান।