ইঞ্জিনসংকটে ধুঁকছে রেলের পণ্য পরিবহন: পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে স্থবিরতা, কমছে ট্রেন ও রাজস্ব

Rail freight transport is suffering due to engine problems
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি:- ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:১১ অপরাহ্ন জাতীয়
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি:- ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:১১ অপরাহ্ন
ইঞ্জিনসংকটে ধুঁকছে রেলের পণ্য পরিবহন: পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে স্থবিরতা, কমছে ট্রেন ও রাজস্ব
ছবি - বিজয় বাংলা

ইঞ্জিনসংকট, পুরোনো লোকোমোটিভের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে কুপোকাত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য সরবরাহ লাইনে তৈরি হয়েছে মারাত্মক স্থবিরতা। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে মাসের পর মাস আটকে থাকছে পণ্যবাহী ওয়াগন। এতে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও উত্তরবঙ্গের জ্বালানি নিরাপত্তা।

​বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা প্রায় ৪৭ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল পরিবহন কমেছে ৮০ শতাংশেরও বেশি। পণ্য পরিবহনে দৈনিক গড়ে লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন বরাদ্দ যেখানে ১১টির বেশি ছিল, তা এখন নেমে এসেছে ৩টির ঘরে।

​পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে : -চট্টগ্রাম-ঢাকা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চরম ভোগান্তি

​চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) এবং শ্রীমঙ্গল-সিলেট রুটে মালবাহী ট্রেন চলাচলে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে।

​ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্ব: -চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড থেকে কমলাপুর আইসিডিতে পণ্যবাহী ট্রেন পৌঁছাতে নির্ধারিত সময় সাড়ে ৯ ঘণ্টা। অথচ সম্প্রতি হাসানপুর-নাঙ্গলকোট সেকশনে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর বিকল্প লোকোমোটিভ না থাকায় একটি ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় ৭৫ ঘণ্টা—যা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৬৬ ঘণ্টা বেশি।

​আখাউড়ায় ১২ দিন আটকে ছিল ট্রেন: যাত্রীবাহী ট্রেনের শিডিউল ঠিক রাখতে পণ্যবাহী ট্রেন থেকে ইঞ্জিন খুলে নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামগামী একটি তেলের ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে অন্য ট্রেনে যুক্ত করায় সেটি আখাউড়ায় টানা ১২ দিন (২৯৬ ঘণ্টা) আটকে ছিল।

​জ্বালানি ডিপোতে স্থবিরতা:- চট্টগ্রাম পোর্ট ইয়ার্ড থেকে শ্রীমঙ্গল ও সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা একাধিক তেলবাহী ট্রেন মাসের পর মাস ইঞ্জিনের অভাবে অলস বসে থাকছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে :- উত্তরবঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি

​পূর্বাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চল-পশ্চিমাঞ্চল সংযোগ রুট হয়ে পণ্য পৌঁছানো বিলম্বিত হওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে।

​উত্তরবঙ্গে পৌঁছাচ্ছে না জ্বালানি-: জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের চাহিদা মেটাতে রংপুর ডিপোর জন্য প্রতি মাসে অন্তত ১০টি এবং ঢাকা ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন ডিপোর জন্য নিয়মিত তেলবাহী ট্রেনের প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় রেলওয়ে প্রয়োজনীয় ট্রেন বরাদ্দ দিতে পারছে না।

​সড়কপথে ব্যয় ও ঝুঁকি বৃদ্ধি:- পাঁচ বছর আগে যেখানে বছরে ৫৮৮টি ট্রেনে ২৩ হাজার ট্যাংকারে জ্বালানি পরিবহন হতো, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২২২টি ট্রেন ও সাড় সাত হাজার ট্যাংকারে। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি খরচে ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে সড়কপথে ট্যাংকার ট্রাকে করে উত্তরবঙ্গে তেল সরবরাহ করতে হচ্ছে।

​৫ বছরে রাজস্ব ও ট্রেন চলাচলের ধস

​রেলওয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২ হাজার ৭৭০টি পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৭টিতে।

​প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়েও:-পণ্য পরিবহন থেকে রেলের আয় ৩৫৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা থেকে কমে ১৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য পরিবহনে দিনে গড়ে প্রায় ১০টি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে গড়ে মাত্র ৩.১৪টিতে।

​অপরিকল্পিত বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কাঠামোর নীতিগত গলদ

​রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেলের ১২১টি প্রকল্পে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে এবং ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেলপথ তৈরি করা হয়েছে। তবে একই সময়ে নতুন ইঞ্জিন কেনা হয়েছে মাত্র ৪০টি, আর কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ৯০টিরও বেশি পুরোনো ইঞ্জিন।

​বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক জানান, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও কোচ না কিনে শুধু ট্র্যাক সম্প্রসারণ করায় পুরো রেল ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এতে করে ৮৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না।

​রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, রেলের অধিকাংশ মিটারগেজ ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল আগেই শেষ হয়ে গেছে। ৫০ থেকে ৬০ বছরের পুরোনো লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে এসব ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ না পাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিল দরপত্র প্রক্রিয়ার কারণে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হতে সময় লাগছে।

​চরম সংকটে ব্যবসায়ীরা

​কম খরচে ভারী পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকলেও ট্রেনের অনির্দিষ্ট সময়সূচির কারণে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, রেলে যেখানে একটি কনটেইনার পাঠাতে ১০ থেকে ১৬ হাজার টাকা লাগে, সড়কপথে তা ১৮ থেকে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পড়ে। তারপরও পণ্য সময়মতো পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পেতে ব্যবসায়ীরা চড়া খরচে সড়কপথ ব্যবহার করছেন, যার প্রভাব পড়ছে সার্বিক উৎপাদন ও দ্রব্যমূল্যের ওপর।

রাজশাহী চেম্বার্স অফ কমার্সের সভাপতি মোঃ হাসেম আলী  জানান,ট্রেন পথে পূর্ণ পরিবহন সাস্রয় হলেও গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে কত সময় লাগে রেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত দিতে পারে না। তাই ব্যবসায়ীরা চড়া খরচে সড়কপথ ব্যবহার করছেন।