বুকিং ১০৪ আসন, তবু বিক্রি হলো টিকিট॥ রেলের সমন্বয়হীনতায় যাত্রী ভোগান্তি, কোচ থেকে নামিয়ে দেওয়া হলো যাত্রীদের
নাটকের শুটিংয়ের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি কোচ আগেই বুকিং দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোকে যথাসময়ে না জানানোয় একই কোচের আসন সাধারণ যাত্রীদের কাছে টিকিট হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। পরে বুকিং করা কোচে ওঠা যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ায় তীব্র ভোগান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড়গামী আন্তঃনগর কাঞ্চন কমিউটার ট্রেনে। অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, নাটকের শুটিং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কয়েক দিন আগে ২৪ সেপ্টেম্বরের জন্য কাঞ্চন কমিউটার ট্রেনের ‘খ’ কোচের ১০৪টি আসন ১৬ হাজার টাকার বিনিময়ে বুকিং করেন। বুকিংয়ের পরও কোচটি যে সাধারণ যাত্রীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়—এ তথ্য ট্রেন চলাচলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব স্টেশনে যথাসময়ে পৌঁছায়নি।
বৃহস্পতিবার ট্রেনটি পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড়ের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার পরও ওই কোচের টিকিট অনলাইনে বিক্রি না হলেও বিভিন্ন স্টেশন থেকে হাতে লিখে যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করা হয়। ফলে টিকিট হাতে নিয়ে যাত্রীরা স্বাভাবিক নিয়মেই ওই কোচে উঠে পড়েন।
পরে ট্রেনটি সেতাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে নাটকের শুটিং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আগে থেকে বুকিং করা কোচটি নিজেদের ব্যবহারের জন্য নিতে চান। এ সময় কোচে থাকা টিকিটধারী যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। এতে যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়।
স্টেশন মাস্টার জানতেন না কোচ বুকিংয়ের কথা:-
সেতাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, নাটকের শুটিংয়ের জন্য কোচটি বুকিং করা হয়েছে। তবে লালমনিরহাট কন্ট্রোল থেকে এ বিষয়ে তাঁদের আগে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, পরে পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁরা জানতে পারেন, কোচটি শুটিংয়ের জন্য বুকিং করা হয়েছে।
শুধু সেতাবগঞ্জ নয়, আরও কয়েকটি স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের কাছেও কন্ট্রোল থেকে আগে কোনো নির্দেশনা বা তথ্য পৌঁছায়নি। ফলে বুকিং করা কোচের আসনও বিভিন্ন স্টেশন থেকে হাতে লিখে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একটি কোচের ১০৪টি আসন যখন নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের বা শুটিং দলের জন্য বুকিং দেওয়া হয়েছিল, তখন সংশ্লিষ্ট সব স্টেশনকে কেন সময়মতো জানানো হলো না? আর বিষয়টি জানানো না হলে স্টেশনগুলো কীভাবে ওই কোচের আসন যাত্রীদের কাছে বিক্রি করল?
সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি কন্ট্রোলার:-
বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় লালমনিরহাট কন্ট্রোলার নিত্য রায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর নাটকের শুটিংয়ের জন্য কাঞ্চন কমিউটার ট্রেনের ‘খ’ কোচটি বুকিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তবে কেন আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট সব স্টেশনকে বিষয়টি জানানো হয়নি—এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি।
কন্ট্রোলার নিত্য রায় দাবি করেন, লোকাল ট্রেনের টিকিটে আসন নির্ধারিত থাকে না। যাত্রীরা যেকোনো কোচে উঠতে পারেন।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাঞ্চন কমিউটার ট্রেনটির আসন বরাদ্দ রয়েছে। অন্যান্য ট্রেনের মতো অনলাইন ও স্টেশন কাউন্টার থেকেও আসনসহ টিকিট সংগ্রহ করা যায়। যেসব স্টেশনে কম্পিউটার ব্যবস্থা নেই, সেসব স্টেশন থেকে হাতে লিখেও আসন বরাদ্দ দিয়ে টিকিট বিক্রি করা হয়।ফলে রেলওয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের টিকিট বিক্রির বাস্তবতার পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একই কোচে রেলের টিকিট, আবার শুটিংয়ের বুকিং:-
ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, একই কোচের আসন কীভাবে একদিকে শুটিংয়ের জন্য বুকিং দেওয়া হলো, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলো থেকে সেই আসনের টিকিট সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিক্রি করা হলো?
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার সামান্য সমন্বয় থাকলেও এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ, একটি কোচ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বুকিং দেওয়ার পর তা কোন তারিখে, কোন ট্রেনে এবং কোন যাত্রাপথে ব্যবহৃত হবে—সেই তথ্য টিকিট বিক্রির সঙ্গে যুক্ত সব স্টেশনে পৌঁছানো প্রয়োজন।কিন্তু এবার সেই সমন্বয় না থাকায় যাত্রীরা অর্থ দিয়ে টিকিট কিনেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের আসন থেকে উঠে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
রেলে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ নতুন নয়:-
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ঘটনা থেকে দেখা যায়, যাত্রীসেবা, টিকিট বিক্রি ও মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ নতুন নয়।
চলতি বছর চট্টলা এক্সপ্রেসে টিকিটধারী যাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি অন্তত আট রেলকর্মীর গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কমিটি ট্রেনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিকেও গুরুত্ব দিয়েছিল।
এর আগে ২০১৯ সালে দিনাজপুর রেলস্টেশনে টিকিট বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে স্টেশন মাস্টারসহ চার রেলকর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তদন্তে নির্দিষ্ট কয়েক দিনের টিকিট বিক্রির হিসাবেও অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
এ ছাড়া রেলের বিভিন্ন ঘটনায় যাত্রী ও রেলকর্মীদের মধ্যে বিরোধ, টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে কাঞ্চন কমিউটারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি রেলের টিকিট ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় কতটা কার্যকর—সে প্রশ্নও সামনে এনেছে।
ডিআরএমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি:-
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে রংপুর রেলওয়ে বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) তসলিম উদ্দিনের ব্যবহৃত সরকারি মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
যাত্রীদের অভিযোগ, রেলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার দায় তাঁদের বহন করতে হচ্ছে। তাঁরা টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছেন, অথচ ট্রেনে ওঠার পর জানতে হয়েছে—তাঁদের কোচটি আগে থেকেই অন্য কাজে বুকিং দেওয়া। পরে তাঁদের কোচ থেকে নামিয়ে দেওয়ায় যাত্রাপথ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
যাত্রীদের প্রশ্ন, রেলের কোনো কোচ বিশেষ কাজে বুকিং দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট সব স্টেশন, কন্ট্রোল রুম, টিকিট বিক্রয়কেন্দ্র এবং ট্রেনের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কাছে আগেই তথ্য পৌঁছানো হবে না কেন?
অন্যদিকে, রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যদি পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় না করেন, তাহলে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে টিকিটের টাকা নেওয়ার পর তাঁদেরই কেন ভোগান্তির শিকার হতে হবে—এ প্রশ্নও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন ঘটনায় শুধু যাত্রীদের দুর্ভোগের অবসান নয়, কোন পর্যায়ে তথ্য আটকে ছিল, কে টিকিট বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে এবং বুকিংয়ের তথ্য সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোতে না পৌঁছানোর জন্য দায়ী কে—তা তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।