জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই রাজশাহী-ঢাকা বাস ভাড়ায় ১০০ টাকা বৃদ্ধি॥ কোথাও আদায় হচ্ছে তার দ্বিগুণ

Rajshahi-Dhaka bus fare hiked by Tk 100 as fuel prices rise
আবুল কালাম আজাদ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:৩৮ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:৩৮ অপরাহ্ন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই রাজশাহী-ঢাকা বাস ভাড়ায় ১০০ টাকা বৃদ্ধি॥ কোথাও আদায় হচ্ছে তার দ্বিগুণ
ছবি - বিজয় বাংলা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজশাহী-ঢাকা রুটে যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া নিয়ে নতুন করে দেখা দিয়েছে অসামঞ্জস্য। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূরপাল্লার ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হলেও রাজশাহী-ঢাকা রুটের অন্তত একটি সাধারণ বাসে এক লাফে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ভাড়া আদায় শুরু হয়েছে।

 অথচ নতুন ভাড়ার চার্ট হাতে না পাওয়ায় কয়েকটি পরিবহনে এখনো আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। ফলে একই রুটে একেক পরিবহনে একেক ধরনের ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

রাজশাহী-ঢাকা রুটে চলাচলকারী আরপি স্পেশাল বাসে আগে ভাড়া ছিল ৬০০ টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এখন যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৭০০ টাকা। আরপি স্পেশালের রাজশাহী কাউন্টারের মাস্টার মো. সাগর জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরই তারা ভাড়া ১০০ টাকা বাড়িয়েছেন।

তবে সরকারের সর্বশেষ নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে এ বৃদ্ধির হিসাব পুরোপুরি মেলে না। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। এর পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ২৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন কাঠামোয় দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে।

রাজশাহী-ঢাকা সড়কপথের দূরত্ব বিবেচনায় সরকারি নির্ধারিত হারে এ বৃদ্ধির পরিমাণ মোটামুটি ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে হওয়ার কথা। সেখানে কোনো কোনো বাসে ১০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হলে প্রশ্ন উঠছে—অতিরিক্ত এই টাকা কোন হিসাবের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে।।

এ বিষয়ে আরপি স্পেশালের কাউন্টার মাস্টার মো. সাগরের কাছে সরকারি নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

একই রুটে ভিন্ন ভাড়া:-

রাজশাহী নগরের শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, শ্যামলী পরিবহন, দেশ ট্রাভেলসসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার পরিবহনের কাউন্টারে নতুন ভাড়ার চার্ট নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে কোনো পরিবহনে আগের ভাড়া, আবার কোনো পরিবহনে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

ন্যাশনাল ট্রাভেলসের রাজশাহী-ঢাকা রুটের নন-এসি

 বাসে আগে ভাড়া ছিল ৭৩০ টাকা। বর্তমানে একই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তবে তাদের বিজনেস ক্লাস এসি বাসের ভাড়া ১০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে। ইকোনমিক ক্লাস এসি বাসের ভাড়া আগের মতো ৯৫০ টাকা রয়েছে।

শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার এনামুল হক বলেন, নতুন ভাড়ার চার্ট না আসায় রাজশাহী-ঢাকা রুটের নন-এসি বাসে এখনো ৭৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। বিজনেস ক্লাস এসি বাসের ভাড়া ১ হাজার ৩০০ টাকা। মালিকপক্ষ নতুন চার্ট সরবরাহ না করা পর্যন্ত অন্যান্য বাসে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।

এসি বাসের ভাড়া নিয়ে আলাদা প্রশ্ন:-

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নির্ধারিত কিলোমিটারভিত্তিক ভাড়া মূলত ডিজেলচালিত সাধারণ বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না। ফলে এসি বাসে ১০০ টাকা বা অন্য কোনো পরিমাণ ভাড়া বাড়ানো হলে সেটি সংশ্লিষ্ট পরিবহনের নিজস্ব ভাড়া কাঠামোর বিষয়।

তবে সাধারণ বা নন-এসি বাসের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ নেই। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও বলেছেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগেও ভাড়া বাড়ানো-কমানো নিয়ে বিতর্ক:-

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে বাসভাড়া সমন্বয় বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ার পর দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। পাঁচ মাসের ব্যবধানেই আবার ১৭ পয়সা বাড়ল বাসভাড়া।

এরও আগে ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১১৪ টাকা করা হলে বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০ পয়সা বা প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। পরে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা কমানো হলেও বাসভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৪ সালে ডিজেলের দাম আরও ৩ টাকা কমানোর পর ভাড়া ৩ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দ্রুত বাসভাড়া বাড়লেও দাম কমার সময় একইভাবে ভাড়া কমানো হয় কি না—এ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

নজরদারির দাবি যাত্রীদের:-

রাজশাহী-ঢাকা রুটে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী যাতায়াত করেন। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খাতে পড়বে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সরকারি নির্ধারিত ভাড়া ও বাস্তবে কাউন্টারে আদায় করা ভাড়ার মধ্যে পার্থক্য থাকলে যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়।

বিশেষ করে একই রুটে কোনো বাসে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, কোথাও ৭৩০ টাকা, আবার এসি ও বিজনেস ক্লাসে ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

যাত্রীদের দাবি, প্রতিটি পরিবহনের কাউন্টারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমানভাবে টাঙিয়ে দেওয়া, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে নিয়মিত তদারকি এবং কোনো পরিবহন অতিরিক্ত ভাড়া নিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক প্রভাব যেমন পরিবহন খাতে সমন্বয় করা সম্ভব হবে, তেমনি যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায়ের সুযোগও কমবে।