গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে রুয়েটের ধারাবাহিক জয়যাত্রা: ষাট দশকের কলেজ থেকে আজ বিশ্বমঞ্চে শীর্ষস্থান
১৯৬৪ সালে মাত্র ১২২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা তৎকালীন 'রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ' আজ দেশের অন্যতম শীর্ষ স্বায়ত্তশাসিত প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ ছয় দশকের পথ চলায় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) কেবল দেশের অবকাঠামো উন্নয়নই নয়, বরং বৈশ্বিক বিজ্ঞান, গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির মঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করে চলেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে আধুনিক রোবটিক্স গবেষণায় শীর্ষ পুরস্কার অর্জন রুয়েটের সেই গৌরবময় সাফল্যের মুকুটে আরও একটি নতুন পালক যুক্ত করল।
আন্তর্জাতিক রোবটিক্স ও গবেষণায় বিশ্বজয়:-
রুয়েটের সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় সাফল্যটি এসেছে আধুনিক রোবটিক্স গবেষণায়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ৫ম আইইইই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে (RAAICON 2026) ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার ১৪টি দেশের মোট ৫১৭টি গবেষণা পেপারকে পেছনে ফেলে রুয়েট 'বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড' জয় করেছে।
ইইই (EEE) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অলোক কুমার পাল এবং ২০২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু তালহা রনির যৌথ গবেষণা 'Autonomous Aerial and Field Robotics For Search and Rescue' দুর্যোগকালীন উদ্ধার অভিযানে ড্রোনের আধুনিক ব্যবহার নিয়ে এক যুগান্তকারী দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এর আগে ২০২৩ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের শিক্ষার্থী আদনান জাওয়াদ তকি বৈশ্বিক আইটি ও প্রোগ্রামিংয়ের অলিম্পিয়াড খ্যাত ৪৫তম আইসিপিসি (ICPC) ওয়ার্ল্ড ফাইনালস-এ অংশ নিয়ে রুয়েটের মেধার স্বাক্ষর বিশ্বমঞ্চে রেখে আসেন।
এছাড়া মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা হোন্ডা ও জাইকা (JICA) আয়োজিত আন্তর্জাতিক 'ইকো রান' প্রতিযোগিতায় পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ি বানিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
জাতীয় ইনোভেশন ও স্টার্টআপ কালচারে আধিপত্য:-
দেশীয় উদ্ভাবন এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে রুয়েট এখন অন্যতম শীর্ষ নাম। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় ইনোভেশন চ্যালেঞ্জের ফাইনালে রুয়েটের রেকর্ডসংখ্যক ১৩টি স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী দল চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় এবং সরকারি সিড ফান্ড লাভ করে।
এর আগে ২০২৫ সালের 'Build4Democracy' সিভিক-টেক প্রতিযোগিতায় ১১৮টি দলকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হয় রুয়েটের 'কোকোনাট ক্রু'। পরবর্তীতে এই দলটি ২০২৬ সালের ইনোভেশন ওয়ার্ল্ড কাপের বাংলাদেশ পর্বেও সিলভার মেডেল জেতে। একই বছরে রাজশাহী-রংপুর স্টার্টআপ সামিটের "ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ"-এ রুয়েটের তরুণ গবেষকরা শীর্ষ তিনটি স্থানই নিজেদের দখলে নিয়েছিলেন।
একাডেমিক মাইলফলক ও স্মার্ট ক্যাস্পাস ২০২৬:-
শুধু প্রতিযোগিতাই নয়, উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাতেও রুয়েট নতুন ইতিহাস গড়ছে। ২০২৫ সালের জুনে সিএসই (CSE) বিভাগ থেকে রুয়েটের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের প্রথম পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়টির উচ্চতর গবেষণার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সাথে রুয়েট প্রশাসন গবেষণা খাতে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বর্ধিত বাজেট বরাদ্দ শুরু করায় বিশ্বমানের ইনডেক্সড জার্নালে শিক্ষকদের প্রকাশনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্যাম্পাসকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও পেপারলেস করতে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে রুয়েট যুক্ত করেছে ডিজিটাল স্টুডেন্ট ক্লিয়ারেন্স এবং অনলাইন সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট উত্তোলন পদ্ধতি। এর ফলে শিক্ষার্থীদের এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে বছরের পর বছর সার্টিফিকেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, যা রুয়েটকে একটি স্মার্ট ডিজিটাল ক্যাম্পাসে রূপান্তর করেছে।
বৈশ্বিক ক্যারিয়ার ও বিসিএস-এ ঈর্ষণীয় সাফল্য:-
রুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আজ শুধু গুগল বা মাইক্রোসফটই নয়, বিশ্বের এক নম্বর বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা (Tesla)-তেও সফলভাবে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সিভিল সার্ভিসেও রুয়েটের শিক্ষার্থীরা মেধার স্বাক্ষর রাখছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসান মাহমুদ তুর্য্য ৪৬তম বিসিএস-এ প্রশাসন ক্যাডারে এবং ৪৭তম বিসিএস-এ পুলিশ ক্যাডারে জাতীয় মেধাক্রমে ৩য় স্থান অর্জন করে এক অনন্য সাধারণ নজির স্থাপন করেছেন।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
ষাট বছর আগের একটি আঞ্চলিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে আজকের রুয়েট হয়ে উঠেছে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্মার্ট সলিউশনের আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র। শিক্ষকদের যুগোপযোগী দিকনির্দেশনা আর শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রুয়েট প্রমাণ করেছে— সঠিক সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীরা যেকোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত।