কাগজে গতি, রেল ট্র্যাকে স্থবিরতা: মেগা প্রকল্পের ভিড়-জরাজীর্ণ ইঞ্জিনে ঝুঁকিপূর্ণ রেলযাত্রা

Speed ​​on paper, stagnation on the rail tracks
আবুল কালাম আজাদ,​বিশেষ প্রতিবেদক:- ০২ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:০৪ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ,​বিশেষ প্রতিবেদক:- ০২ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:০৪ অপরাহ্ন
কাগজে গতি, রেল ট্র্যাকে স্থবিরতা: মেগা প্রকল্পের ভিড়-জরাজীর্ণ ইঞ্জিনে ঝুঁকিপূর্ণ রেলযাত্রা

নথিপত্রে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার রূপরেখা আর দ্রুতগতির ট্রেন চালানোর চোখধাঁধানো পরিকল্পনা—সবই প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবে লাইনচ্যুত হতে থাকা জরাজীর্ণ ট্র্যাক, বিকল সিগন্যালিং আর মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের ঝুঁকি সামলে ট্রেন টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেবল এক একজন লোকো মাস্টার (চালক)। কাগজ-কলমের এই চটকদার মেগা প্রকল্প আর মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতার ব্যবধান খতিয়ে দেখেছে এই অনুসন্ধান।


​কাগজে গতির ঝিলিক, লাইনে লাল সংকেত:-

​বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রতি বছর রেলওয়ের জন্য বিপুল বরাদ্দ থাকলেও যাত্রীর সময়ের সুরক্ষায় তার প্রতিফলন নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের নীতিগত পরিকল্পনা ও মাঠের চিত্রে বড় ধরনের বৈপরীত্য স্পষ্ট। 

​পরিকল্পনার খাতায়ঃ ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানোর উপযোগী রুট তৈরির প্রতিশ্রুতি।

​লাইনের বাস্তবতাঃ ক্ষয়ে যাওয়া পাত, জরাজীর্ণ কাঠের স্লিপার ও দুর্বল ব্রিজের কারণে অধিকাংশ রুটে ট্রেনের গড় গতি নেমে এসেছে ৩০-৪০ কিলোমিটারে। দুর্ঘটনা এড়াতে রেলজুড়ে জারি রাখতে হচ্ছে শত শত ‘কশন’ (গতিসীমা নির্দেশনা)।


মেগা প্রকল্প বনাম খোদ ইঞ্জিনের দশা:-

​রেলওয়ের নিজস্ব তথ্যানুযায়ী, বহরে থাকা মোট ২৯৪টি লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) মধ্যে ১৫০টিরও বেশি ইতোমধ্যে তাদের স্বাভাবিক ২০ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার করেছে। চার যুগের পুরোনো ইঞ্জিনও কারখানা থেকে বারবার তালি মেরে ট্র্যাকে নামানো হচ্ছে।


খাতকাগজ-কলমে বা দাপ্তরিক লক্ষ্যমাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র:-

ট্রেনের গতিসীমা১০০–১২০ কিমি, কিন্তু বাস্তবে ঘণ্টা৩০–৫০ কিমি/ঘণ্টা। ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব মেয়াদের মধ্যে (সর্বোচ্চ ২০ বছর)৫০%-এর বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ, কোনোটি ৪৮–৬৭ বছরের পুরোনো।সিগন্যালিং ব্যবস্থাডিজিটাল/অটোমেটিক কালার লাইটম্যানুয়াল ফ্ল্যাগ ও জরাজীর্ণ হাত-সিগন্যাল।জনবল কাঠামোপূর্ণাঙ্গ অনুমোদিত পদচালক, গার্ড ও প্রকৌশলী খাতে ব্যাপক শূন্যপদ।


চালকের একক মেধা ও মানবিক ঝুঁকি:-

​ইঞ্জিনগুলোর ভেতরের অটোমেটিক ট্রেন স্টপ (ATS) সহ অনেক জরুরি সুরক্ষাযন্ত্র অকার্যকর থাকায় সব দায়িত্ব এসে পড়ে চালকের ওপর।

​প্রযুক্তির অভাব:সিগন্যাল অস্পষ্ট থাকা বা কুয়াশার সময় অটোমেটিক ব্রেক কাজ না করায় চালককে সজাগ দৃষ্টির ওপর ভরসা করতে হয়।

​মানসিক চাপ-ক্রু ও লোকো মাস্টারের তীব্র সংকটে ওভারটাইম বা অতিরিক্ত শিফটে কাজ করতে গিয়ে মানসিকভাবে চরম ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন তারা। সামান্য ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটির দায়ও সরাসরি এসে পড়ছে তাদের ওপর।


নথির আমলাতন্ত্র ও জনবল সংকট:-

​পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা (কেলোকা) ও পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব নিত্যদিনের ঘটনা।

​যন্ত্রাংশ জটিলতা:,৩৪ হাজারেরও বেশি যন্ত্রাংশনির্ভর একটি ইঞ্জিনের পার্টস সংগ্রহ করতে গিয়ে ডলারে ছাড়পত্র না পাওয়া বা এলসি জটিলতায় মাসের পর মাস কাজ আটকে থাকে।

​ফাইলবন্দী অগ্রগতি:, ট্র্যাক সংস্কার ও নতুন বগি বহরে যুক্ত করার ফাইল প্রশাসনিক জটিলতায় বছরের পর বছর ঘুরপাক খায়, অথচ প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা বাড়ে ধাপে ধাপে।


​পরিকল্পনার নথিতে রেলকে আধুনিক করার ভূয়সী প্রশংসা থাকলেও বাস্তবতার ট্র্যাকে যাত্রী ও ট্রেন ক্রুদের প্রতিদিন মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রাণঘাতী ঝুঁকির। কাগজ-কলমের এই তথাকথিত অগ্রগতি বাস্তবে চালকের একক উপস্থিতিবুদ্ধির ওপর ভর করে চলছে। নীতি নির্ধারকরা নথির ফাইল থেকে বেরিয়ে রেলের মৌলিক অবকাঠামো ও মেকানিক্যালে নজর না দিলে কাগজের এই উন্নয়ন ট্র্যাকে কোনোদিন বাস্তবায়িত হবে না।