সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও লেজুড়বৃত্তিতে সংকটে গণমাধ্যম: প্রভাব পড়ছে সমাজে, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের ঐক্যের ডাক
সংবাদ পাওয়ার অধিকার, সত্য উদঘাটন এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের প্রধান হাতিয়ার গণমাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে সেই গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা পেশা মুখোমুখি এক গভীর সংকটের। সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, লেজুড়ভিত্তিক দলীয় রাজনীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য সহকর্মীদের প্রতি বিরূপ আচরণ এবং দলগত বিভাজন পুরো পেশাটিকে আস্থার সংকটে ফেলে দিয়েছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক সামাজিক কাঠামোর ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বড় একটি অংশ পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক অনুকম্পা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে বেশি সক্রিয়। সহকর্মীকে প্রতিপক্ষ মনে করে অপপ্রচারে লিপ্ত হওয়া কিংবা পেশাগত নীতি বিসর্জন দিয়ে দলীয় স্বার্থে সত্য গোপন করার প্রবণতা বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী এর পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে।
সাংবাদিকদের এই অনৈক্য ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের প্রবীণ সাংবাদিক, সম্পাদক ও মিডিয়া বিশ্লেষকরা।
দৈনিক জনকণ্ঠের প্রাক্তন প্রধান সম্পাদক ও প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী সতর্ক করে বলেছিলেন, "সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাংবাদিক, গণমাধ্যম এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ।"
পেশার অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ি কিভাবে অপরাধীদের মদদ দেয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল।
তাঁর মতে, "দলাদলি করলে দুর্নীতিবাজরা লাভবান হয়, আর সাংবাদিকরা হারায় তাদের বিশ্বাস ও সম্মান।
একই সুর প্রবীণ সাংবাদিক ইয়ানুর রহমানের কণ্ঠেও। তিনি জানান, সাংবাদিকরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে প্রকৃত শত্রু—দুর্নীতিবাজ ও মাফিয়ারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সহকর্মীদের প্রতি বৈরী আচরণ ও দলাদলি নারী সাংবাদিকদের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক রোকেয়া কবির বলেন, "সাংবাদিকদের মধ্যে রেষারেষি নারীদেরও পিছিয়ে দেয়। আমরা চাই পেশাগত সহযোগিতা, ব্যক্তিগত বৈরিতা নয়।
সাংবাদিকদের দলীয় মেরুকরণের ফলে সাধারণ জনগণ গণমাধ্যমের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছে—এমনটিই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
প্রবীণ সাংবাদিক ও সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, "সাংবাদিকদের সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার। সৈয়দ আবদুল মোমেন, আসাদুজ্জামান রিপন এবং প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর মতে, মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু লেজুড়বৃত্তি ও স্বার্থের লড়াই সত্য উন্মোচনের বদলে কেবল প্রভাবশালীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। এতে সাংবাদিকতার বিকাশ থমকে যায়।
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রাক্তন সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র সাহা ও দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক রাশেদ হোসাইন স্পষ্ট জানান, সাংবাদিকদের প্রধান শক্তি তাদের একতা। সাংবাদিকদের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গ্রুপ বা ব্যক্তি স্বার্থের পক্ষে নয়, বরং সত্য ও জনগণের পক্ষে হওয়া উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি বন্ধ না হলে গণমাধ্যম তার 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে ভূমিকা হারাতেই থাকবে। সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে এখনই ব্যক্তিগত স্বার্থ ভুলে সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্যে ফিরে আসা জরুরি।