নাচোল বিদ্রোহের ৭৬ বছর

রক্তঝরা অধ্যায় ও 'নাচোলের রানি' ইলা মিত্রের সংগ্রামের ইতিহাস

Ila Mitra
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০১:০৭ অপরাহ্ন মতামত
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০১:০৭ অপরাহ্ন
রক্তঝরা অধ্যায় ও 'নাচোলের রানি' ইলা মিত্রের সংগ্রামের ইতিহাস
ছবি : বিজয় বাংলা

অবিভক্ত বাংলার নাচোল অঞ্চলে কৃষকদের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন এবং সংগ্রামী নেত্রী ইলা মিত্রের গ্রেফতার ও ট্র্যাজিক বন্দিজীবনের ইতিহাস উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলন ও মুক্তির সংগ্রামের এক রক্তঝরা অধ্যায়। ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে গ্রেফতারের পর তৎকালীন পাকিস্তান পুলিশের বর্বর নির্যাতন ও ঐতিহাসিক আদালতের বিচার প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নির্মম রূপ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছিল।

নাচোলের প্রেক্ষাপট ও 'রানি মা'র উত্থান:-

১৯৪০-এর দশকে সামন্তবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয় তেভাগা আন্দোলন, যার মূল দাবি ছিল উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ ভাগচাষীর (কৃষকের) এবং এক ভাগ জমিদারের। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল অঞ্চলে এই আন্দোলনকে শাণিত ও সুসংগঠিত করার মূল কারিগর ছিলেন রাজপ্রাসাদের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে আসা বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্র।

সাঁওতাল ও স্থানীয় ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার রক্ষায় তাঁর নেতৃত্ব, সংকল্প ও সহমর্মিতা আন্দোলনকারীদের কাছে তাঁকে পরম শ্রদ্ধেয় 'নাচোলের রানি' বা 'রানি মা' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

রহনপুরে গ্রেফতার ও নাচোল থানায় মধ্যযুগীয় নির্যাতন:-

নাচোলে পুলিশ ও কৃষকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। সাঁওতাল সহযোদ্ধাদের রক্ষা ও আন্দোলন অক্ষুণ্ণ রাখার তাগিদে তাদের সাথে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালান ইলা মিত্র। তবে ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি রহনপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন।

গ্রেফতারের পর নাচোল থানায় টানা তিন দিন ধরে তাঁর ওপর চালানো হয় অমানুষিক শারীরিক ও চরম যৌন নির্যাতন।অন্ধকার কক্ষে সম্পূর্ণ খাদ্য ও পানিহীন অবস্থায় আটকে রেখে চালানো হয় নির্যাতন।বন্দুকের বাট দিয়ে নির্বিচারে প্রহার ও পায়ে পেরেক বিঁধে শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়।এছাড়া তার যৌনাংশে উত্তপ্ত ডিম প্রবেশ করানোর মতো বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়।এত নির্যাতন সত্ত্বেও অকুতোভয় এই বিপ্লবী নেত্রী আন্দোলন বা তাঁর সহযোদ্ধাদের গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি।

পরবর্তীকালে তাঁকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৫০ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে লিখিত জবানবন্দিতে ইলা মিত্র তাঁর ওপর চলা বীভৎস ও রোমহর্ষক নির্যাতনের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেন, যা তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিচারব্যবস্থায় এক তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রদ্রোহ ও পুলিশ হত্যার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে 'ক্রাউন বনাম ইলা মিত্র ও অন্যান্য' শিরোনামে ঐতিহাসিক মামলা দায়ের করে। রাজশাহী দায়রা জজ আদালত শুনানির পর তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুক্তি ও উত্তরসূরিদের জন্য প্রেরণা কারাগারে দীর্ঘ অত্যাচার ও অমানুষিক নির্যাতনের মুখে ইলা মিত্রের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। ১৯৫৪ সালে অমানবিক স্বৈরাচারী শাসনের মুখে জনদাবি তীব্র হলে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট সরকার তাঁকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গমন করেন।

নাচোল বিদ্রোহের ৭৬ বছর পর আজও একজন নারী বিপ্লবীর এই দৃঢ়তা, অসীম আত্মত্যাগ ও নীতির প্রশ্নে অটল অবস্থান অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অধিকারকামী মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।