রংপুরের প্রকল্প যাচ্ছে লালমনিরহাটে, মন্ত্রীর ‘ডিও লেটারে’ ক্ষোভ
রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর ডিও লেটারের (আধা-সরকারি পত্র) ভিত্তিতে এ প্রস্তাব করা হয়। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমতি চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
চিঠি প্রকাশের পর রংপুরে জনমনে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। প্রকল্পটি রংপুরেই বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই দাবি জানিয়েছেন বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা সেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জোসেফা ইয়াসমিন সই করা চিঠিটি গেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত কাঠামো বিভাগের সদস্যের (সিনিয়র সচিব) কাছে।
চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি রংপুর বিভাগের কেন্দ্রটি রংপুর সদর উপজেলার মন্থনা মৌজায় নির্মাণের কথা ছিল। সেখানে বিভিন্ন খতিয়ানে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত জমি তিন ফসলি হওয়ায় জমির মালিকরা লিখিতভাবে আপত্তি জানান। ফলে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটে কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন। লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বৈরাগিকুমুর ও নওদাবস মৌজায় মোট ১০ একর জমি প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, লালমনিরহাটে কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হলে প্রকল্প এলাকা বদলে যাবে। তখন ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। ডিও পত্র অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমতি চাওয়া হয়েছে এবং ডিপিপি সংশোধনের সময় বিষয়টি যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ২০০ শয্যার নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হয়েছে।
গত ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাত বিভাগীয় শহরে কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বাস্তবায়ন করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
সারাদেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র মাত্র চারটি। তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় কেন্দ্রের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় আঞ্চলিক কেন্দ্র থাকলেও রংপুরের মানুষের জন্য সরকারি কোনো সেবা ছিল না। রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষ চিকিৎসাসহ নানা সেবার জন্য বিভাগীয় সদরের ওপরই নির্ভরশীল। অথচ অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত জমি নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে রংপুর সদরে বিকল্প জায়গায় জমি খোঁজা হয়েছে কি-না, চিঠিতে তার কোনো উল্লেখ নেই। বিভাগীয় শহরের জন্য অনুমোদিত প্রকল্প কেন অন্য জেলায় নেওয়া হচ্ছে সে বিষয়েও কোনো যুক্তি দেওয়া হয়নি।
রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রস্তাবে ক্ষোভ জানিয়েছেন রংপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির স্থানীয় নেতারাও।
তাদের দাবি, বিভাগীয় প্রকল্প বিভাগীয় শহরেই স্থাপন করতে হবে, যাতে বিভাগের অন্য জেলার মানুষের যাতায়াত ও সেবা পাওয়া নিশ্চিত হয়।
রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কথা বলা হলেও আমাদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়নি। সরকারি এ ধরনের প্রকল্পের জন্য রংপুরে প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাবে। তাই প্রকল্পটি রংপুরেই বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করেই রংপুরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্য কোনো জেলা নিজ এলাকায় প্রকল্প চাইলে সেটি আলাদাভাবে করতে পারে।’
যা বলছেন অন্যরা
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রংপুর মহানগরের সদস্যসচিব আব্দুল মালেক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রংপুরের জন্য প্রস্তাবিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে স্থানান্তরের জন্য ত্রাণমন্ত্রী আবেদন করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য হলে এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা, ন্যায্যতা ও জনস্বার্থ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়। বিষয়টি শুধু অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্ন নয়, এটি রংপুর অঞ্চলের মানুষের সেবা পাওয়ার অধিকার, উন্নয়নের ন্যায্য বণ্টন এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ববোধের প্রশ্ন।’
সমাজ পরিবর্তন ও উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি মোস্তফা সাব্বির বলেন, ‘রংপুর বিভাগের প্রাণকেন্দ্র রংপুর সিটি করপোরেশন। ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটের বড়বাড়িতে স্থাপনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা অযৌক্তিক।’
তিনি বলেন, ‘বড়বাড়ি একটি পকেট এরিয়া। সেখানে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান হলে বিভাগের অন্য জেলা ও উপজেলার মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই রংপুর শহরেই এটা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
রংপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করছি না। যেহেতু রংপুর সিটি করপোরেশন এবং বিভাগের হেডকোয়ার্টার, তাই এই ধরনের মাদক নিরাময় কেন্দ্র আমাদের এখানে হওয়াই উচিত। আমাদের এই ভাগের কেন্দ্রটা নিয়ে যাওয়া মোটেও সমীচীন নয়। আমি এর প্রতিবাদ করছি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘রংপুর এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখান থেকে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাটের মোগলহাটের দূরত্ব প্রায় সমান। ফলে সেবাধর্মী কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপন করা হলে সেবা শতভাগ নিশ্চিত হবে না। জনসেবা শতভাগ নিশ্চিত করতে যে স্থানে স্থাপন করলে সবাই সমানভাবে সুবিধা পাবে, সেটিই বেছে নেওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় প্রকল্পের বড় অংশ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলে যেত। এখনো মন্ত্রীরা যদি প্রকল্প নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে যান, তাহলে সমতা বজায় থাকবে না। যে উদ্দেশ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়, তার ফলও তখন নিশ্চিত হয় না।’
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ হোসেন বলেন, ‘প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি অধিগ্রহণের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়ে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়। এরপর অধিগ্রহণের গণবিজ্ঞপ্তি জারিসহ পরবর্তী সব ব্যবস্থা নেয় জেলা প্রশাসন। তবে পরে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসন জানান, সেখানে কিছু জটিলতা রয়েছে। তারা তা সমাধানের চেষ্টা করছেন।
মাসুদ হোসেন আরও বলেন, অনানুষ্ঠানিকভাবে তারা জানতে পেরেছেন, প্রকল্পটি লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্প পরিচালক সম্প্রতি লালমনিরহাটে গিয়ে প্রস্তাবিত জায়গা দেখে এসেছেন। তবে প্রকল্পটি রংপুরে বাস্তবায়নের জন্য তারা কাজ করছেন।