ছাতিমের সুবাসে হেমন্তের মায়া, অন্য এক রাজশাহী

The magic of autumn in the fragrance of ch'atim
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ০২:১৫ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ০২:১৫ অপরাহ্ন
ছাতিমের সুবাসে হেমন্তের মায়া, অন্য এক রাজশাহী
ছবি - বিজয় বাংলা

​কার্তিকের সতেজ কুয়াশা আর ছাতিম ফুলের আকুল করা সুবাসে হেমন্ত এসেছে ভিন্ন এক রূপে। আধুনিক নগরায়ণের যান্ত্রিক কোলাহল ঠেলে পদ্মাধৌত ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী মহানগরীর রাজপথে এখন বইছে এক মায়াবী হাওয়া। 

দেশীয় বৃক্ষরোপণের এই দৃশ্যমান সুফল আজ মুগ্ধ করছে পথচারী ও নগরবাসীকে। দিনের প্রখর রোদে ঘন সবুজ পাতার ছায়া যেমন পথিককে জুড়ায়, তেমনই সাঁঝ নামতেই ছাতিমের ব্যাকুল সুবাসে সুরভিত হয়ে ওঠে পুরো চত্বর।

​ছাতিমের এই সুবাসে বারবার ফিরে আসে বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত স্মৃতি। কালজয়ী কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে হেমন্তের এই রূপ ধরে রেখেছিলেন এভাবে—

​“অপু বলিল, কী ফুলের গন্ধ বেরুচ্ছে, দিদি? তাহাদের মা বলিল, তাহাদের জ্যেঠামশায়ের ভিটার পিছনে ছাতিম গাছ আছে, সেই ফুলের গন্ধ। তাহার পর সকলে গিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। রাত্রি গভীর হয়। ছাতিম ফুলের উগ্র সুবাসে হেমন্তের আঁচলাগা শিশিরাদ্র নৈশবায়ু ভরিয়া যায়। মধ্যরাতে বেনুবনশীর্ষে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের ম্লান জ্যোৎস্না উঠিয়া শিশিরসিক্ত গাছপালার ডালে পাতায় চিকচিক করছে।”


​আজকের নগর-রাজশাহীতে যেন সেই কথাসাহিত্যেরই দৃশ্যমান প্রতিফলন। রেলগেট থেকে সিঅ্যান্ডবি মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের দুই পাশজুড়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ ছাতিম গাছ। এছাড়া শ্রীরামপুরে জেলা প্রশাসকের বাংলোর সমুখপানে, সিপাইপাড়া কারাভূমির পেছনের পথ, উপশহর কিংবা সপুরের বিস্তৃত ফুটপাত—সবখানেই এখন ছাতিমের সবুজ উৎসব।

​অক্টোবরের সূচনাতেই ডালপালায় জাগে নতুন কুঁড়ি। ফুল ফুটতেই চারপাশ ভরে ওঠে এক মাদকতাময় সুবাসে। গোধূলিলগ্নে কর্মক্ষেত্র শেষে নীড়ে ফেরা মানুষ কিংবা নৈশকালীন নিয়মিত পথচারীদের মনে এই প্রাক-শীতের বাতাস এক অদ্ভুত প্রশান্তি জাগায়।

​রেলগেট এলাকার ফুটপাতে সান্ধ্যকালীন পরিভ্রমণে বের হওয়া কলেজের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর কবির নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে হয়। একসময় ধুলোবালি আর যানবাহনের বিকট শব্দে হাঁটাই দায় হতো। আজ এই ছাতিমের মিষ্টি গন্ধে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারি। হাঁটার এই ক্লান্তিকর সময়টা এখন মন ভালো করা এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।”

​তবে কেবল সৌরভ ছড়ানোতেই শেষ নয়; এই ছাতিমবৃক্ষ হয়ে উঠেছে খেটে খাওয়া মানুষের নির্ভরতার আশ্রয়। সিঅ্যান্ডবি মোড়ের ডাব বিক্রেতা হাসান আলী কিংবা ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা শিহাব আহমেদের গল্পটাও একই রকম। রোদ থেকে ডাব কিংবা শাকসবজিকে তাজা রাখতে আর নিজেদের ক্ষণিক স্বস্তি দিতে এই ছাতিমের ছায়াই তাঁদের বড় সম্বল। তপ্ত রোদে পথচলতি মানুষের জিরিয়ে নেওয়ার একটু শান্তির নীড়ও যেন এই গাছগুলো।

​পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কীভাবে একটি নগরকে পরিবেশবান্ধব ও সৌন্দর্যময় করে তুলতে পারে, রাজশাহীর এই ছাতিমগাছগুলো তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

​নগরীর এই প্রাকৃতিক রূপান্তরের বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পরিবেশ উন্নয়ন কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ উল ইসলাম জানান, “ছাতিম দ্রুত বর্ধনশীল একটি বৃক্ষ। প্রচণ্ড রোদে এটি যেমন পথচারীদের শীতল ছায়া দেয়, তেমনি হেমন্তে এর সুবাস চারপাশ মাতিয়ে রাখে। ফুল ঝরে পড়ার পর আমরা নিয়ম মেনে এর বীজ সংগ্রহ করি এবং পরবর্তীতে নিজস্ব নার্সারিতে চারা উৎপাদন করা হয়, যেন এই সবুজ ধারা অব্যাহত থাকে।”

​শরৎ শেষের এই হেমন্তে ছাতিমের সুবাসে ব্যাকুল রাজশাহী যেন কেবল ইট-কাঠের শহর নয়—এক রূপময় সাহিত্যের ক্যানভাস।