৪ বছরে নতুন দরিদ্র ৮০ লাখ-ঝুঁকিতে আরও ৬ কোটি ॥ বাড়ছে ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য
বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশে নতুন করে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। একই সঙ্গে ধনী ও গরিবের মধ্যে আয়বৈষম্য উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
এছাড়া দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করা আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ যেকোনো মুহূর্তে দরিদ্র হয়ে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালে ছিল ২১.৪ শতাংশ। এর আগে ২০২৪ সালে এই হার ছিল ২০.৫ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে এই হার বৃদ্ধি দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২২ সালের হিসাব মতে, সে সময় দেশে প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতেন। পরবর্তী সময়ে ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মৌলিক চাহিদার সংকট
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে চরম কঠিন করে তুলেছে। চাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, গৃহস্থালি গ্যাস এবং বাসাভাড়াসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় জ্যামিতিক হারে বাড়লেও অধিকাংশ মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংঙ্কট:-
কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়া এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। দেশে নতুন বড় ধরনের বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত আয়ের উৎস হারাচ্ছেন। এতে পরিবারগুলোর সঞ্চয় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এবং যেকোনো আর্থিক সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য:-
দারিদ্র্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজে ধনী-গরিবের আয়ের ব্যবধান তীব্র হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ধনী-গরিবের আয়বৈষম্যের সূচক (Gini Coefficient) ছিল ৩০.৯ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৩৪.৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না বলেই এই বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও বিশেষজ্ঞ মত:-
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থাকা ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছেন। যেকোনো আকস্মিক চাকরি হারানো, আয় কমে যাওয়া, বন্যা বা সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বাজারে নিত্যপণ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধি এদের একটি বড় অংশকে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন শিল্পায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া এই কাঠামোগত দারিদ্র্য সংকট নিরসন করা সম্ভব নয়। এজন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) বিকাশে বিশেষ উদ্দীপনা দেওয়া জরুরি। একই সাথে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।