রাজশাহীতে ৪০ হাত উঁচু দেবীমূর্তি: থিমের বৈচিত্র্য ও ভক্তির অপূর্ব সমন্বয়
কখনো বিশ্বকাপ ফুটবলের ট্রফি, কখনো ডাকভবন, আবার কখনো কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর রুপালি গিটার—বছর বছর ভিন্ন ভাবনায় পূজামণ্ডপ সাজিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় রাজশাহী মহানগরীর রানীবাজারের টাইগার সংঘ।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে প্রায় ৪০ হাত উঁচু দেবীমূর্তি ও বিশাল এক প্যান্ডেল। মণ্ডপের বিশালতা, প্রতিমার শৈল্পিক উপস্থাপনা আর আকর্ষণীয় আলোকসজ্জা দেখতে এখন প্রতিদিন উপচে পড়া ভিড় জমছে নগরবাসীর। একদিকে শৈল্পিক চমক, অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতি ও প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে।
নির্মাণকাঠামোয় বিশালতার চমনির্মাণকাঠামোয় বিশালতার চম
রাজশাহীর দুর্গাপূজায় ব্যতিক্রমী মণ্ডপ নির্মাণের জন্য বরাবরই আলাদা খ্যাতি রয়েছে টাইগার সংঘের। সমসাময়িক ঘটনা, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে মণ্ডপের নকশায় ফুটিয়ে তুলতে তারা সিদ্ধহস্ত। অতীতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, আইয়ুব বাচ্চুর রুপালি গিটার এবং করোনা মহামারির সময় মাস্ক ও স্যানিটাইজারের আদলে মণ্ডপ সাজিয়ে তারা দেশজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশেষ করে, ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে ২৬ ফুট উঁচু ট্রফির আদলে মণ্ডপ নির্মাণ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল সংগঠনটি। সে সময় প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওই মণ্ডপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর পতাকা ও বিশ্বকাপের প্রতীক রাখা হয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ডাকভবনের আদলে মণ্ডপ সাজিয়ে ডাক বিভাগের ঐতিহ্য, পুরোনো চিঠি ও ডাকটিকিটের স্মৃতি জীবন্ত করে তুলেছিল তারা।
নির্মাণকাঠামোয় বিশালতার চমক:-
এবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ৪০ হাত উঁচু দেবীমূর্তি। উঁচু বাঁশ ও কাঠের মজবুত কাঠামোর ওপর স্থাপিত বহু হাতবিশিষ্ট দেবী দুর্গার এই বিশাল অবয়ব দূর থেকেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ছে। প্রতিমার নিখুঁত অলংকরণ, পোশাকের নকশা, রং এবং আলোকসজ্জার সুনিপুণ ব্যবহারে পুরো আয়োজনটি পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
টাইগার সংঘের সভাপতি অশোক সোমানি বলেন, ‘আমরা প্রতিবছরই ভক্তি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুনত্বের সমন্বয় করার চেষ্টা করি। এবারের আয়োজনেও সেই ধারা অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে প্রতিমা উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য নির্মাণকাজে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পার্থ পাল চৌধুরী জানান, এত বড় ও উঁচু স্থাপনা নির্মাণে নকশা প্রণয়ন, কাঠামোর ভার বহনের সক্ষমতা, ভারসাম্য, সংযোগস্থলের দৃঢ়তা এবং বাতাসের চাপ—সব বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। কারিগরি দক্ষতা ও যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেই প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিমা ও মণ্ডপটি নির্মাণ করা হয়েছে।
দর্শনার্থীদের কৌতূহল ও ভক্তদের প্রার্থনা:-
টাইগার সংঘের মণ্ডপে একদিকে যেমন বিশাল স্থাপনা দেখতে ভিড় করছেন উৎসুক জনতা, অন্যদিকে পূজা-অর্চনা ও প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তরা। পরিবার-পরিজন নিয়ে মণ্ডপে এসে আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি ভক্তরা দেবীর কাছে শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করছেন।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মিতালী ঘোষ বলেন, ‘প্রতিমাটি অত্যন্ত বিশাল ও সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। এর নকশা ও আলোকসজ্জা শিশুদেরও দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে।’
তবে দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী সুমন দাস জানান, বিপুল ভিড়ের মধ্যে চলাচল সহজ করতে এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আরও কিছু বাড়তি ব্যবস্থা থাকলে আরও ভালো হতো।
ভক্ত অর্পিতা রায় বলেন, ‘মণ্ডপের নান্দনিক সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি পরিবারের শান্তি ও মঙ্গল কামনায় দেবীর চরণে প্রার্থনা করেছি। এমন উৎসবমুখর পরিবেশে প্রার্থনা করার অনুভূতি সত্যিই আনন্দের।’
ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন:-
রাজশাহীতে দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো কেবল ধর্মীয় আচার পালনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি নগরবাসীর মিলনমেলা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগের অন্যতম বড় ক্ষেত্রে পরিণত হয়। টাইগার সংঘের প্রতিবছরের অভিনব থিম এই উৎসবের আমেজকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কমিটির সদস্য প্রদীপ কুমার বলেন, ‘আগের কমিটিগুলো যে সুনাম ও ধারা তৈরি করে গেছে, আমরা তা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। নতুন প্রজন্মের দর্শনার্থীদের পূজা উৎসবের প্রতি আকৃষ্ট করার পাশাপাশি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ঐতিহ্য বজায় রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মণ্ডপে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের ভিড় এড়াতে একদল দক্ষ স্বেচ্ছাসেবক সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।