ধুঁকছে পদ্মা: কমছে প্রবাহ, অস্তিত্ব হারাচ্ছে মাছে-ভাতে বাঙালির ইলিশ ও দেশীয় প্রজাতি
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—এই চিরচেনা প্রবাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নদ-নদী আর জেলের জাল। একসময় রাজশাহীর পদ্মায় গোদাগাড়ী থেকে চারঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত বুকজুড়ে ছিল মাছের অবাধ রাজত্ব।
জেলের জালে অবলীলায় ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ, বিশালাকার বাঘাইড়সহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। বিশেষ করে গোদাগাড়ীর পদ্মায় মাঝারি থেকে বড় আকারের ইলিশের প্রাচুর্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে সেই সোনালী দিন এখন কেবলই অতীত স্মৃতি। পদ্মার বুকে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে পানির প্রবাহ ও গভীরতা। নদের বিভিন্ন অংশে জেগে উঠেছে বড় বড় চর, বেড়েছে বালুর আধিক্য। এর প্রভাবে একদিকে যেমন পদ্মায় মাছের প্রাপ্যতা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, অন্যদিকে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে বহু প্রজাতির দেশীয় মাছ। জীবন-জীবিকার চাকা সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন নদীনির্ভর হাজারো জেলে পরিবার।
পানির প্রবাহ হ্রাস ও ফারাক্কার মরণফাঁদ:-
নদী গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মার এই করুণ দশার পেছনে রয়েছে বহুমুখী কারণ। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাব। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বাঁধ চালুর আগে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পদ্মায় প্রতি সেকেন্ডে পানির প্রবাহ ছিল ৯ হাজার ৩২ ঘনমিটার। বাঁধ চালুর পর ১৯৭৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তা নেমে আসে মাত্র ৫ হাজার ১৪৬ ঘনমিটারে।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানান, পাকিস্তান আমলেও বঙ্গোপসাগর থেকে উজানে রাজশাহী হয়ে ভারতের ভাগলপুর পর্যন্ত ইলিশ যেত এবং ডিম ছাড়ত। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম করে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। আশির দশক থেকেই পদ্মায় ইলিশের পরিমাণ কমতে শুরু করে।
গবেষকদের মতে, ইলিশ দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে পছন্দ করে এবং এর স্বাভাবিক বিচরণের জন্য পানির গভীরতা অন্তত ২০ থেকে ২৫ ফুট হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ড্রেজিংয়ের আধিক্য ও পলিসঞ্চয়নের ফলে পানিতে বালুর পরিমাণ বেড়ে পানি ঘোলা হয়ে গেছে এবং গভীরতা কমেছে। ফলে নিচু এলাকা থেকে উজানে আর আগের মতো আসতে চায় না ইলিশ। এ ছাড়া কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বর্ষার পানিতে মিশে নদী ও ডোবার জলজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত করছে, যা দেশীয় মাছের প্রজনন ও টিকে থাকার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
তলানিতে ঠেকেছে ইলিশ ও দেশীয় মাছের উৎপাদন:-
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রাজশাহী জেলায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে ২৮ দশমিক ৫৫ টন ইলিশ ধরা পড়েছিল, সেখানে গত আট বছরের ব্যবধানে এই আহরণ তলানিতে ঠেকেছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন পয়েন্টে ইলিশ আহরিত হয়েছে মাত্র ৪৭৩ টন।
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, ইলিশের প্রজনন ও যৌবনপ্রাপ্তির জন্য স্বাদু পানির অবাধ প্রবাহ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু নদীতে পর্যাপ্ত পানি ও স্বাভাবিক স্রোত না থাকায় এর প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
একই চিত্র দেশীয় অন্যান্য মাছের ক্ষেত্রেও।
মৎস্য অধিদপ্তর রাজশাহী জেলার তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদী থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশীয় মাছ আহরণ হয়েছিল ২ হাজার ২৮৩ টন, যা ক্রমান্বয়ে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২০ টনে। গত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র দেশীয় মাছের আহরণ কমেছে ৪৩৩ টন। ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মার ৬০ শতাংশ মৎস্য প্রজাতিই আজ বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে।
আড়তে নেই নদীর মাছ, আকাশছোঁয়া দাম:-
সম্প্রতি সরেজমিনে গোদাগাড়ীর রেলওয়ে বাজার, মৎস্য আড়ত ও পদ্মা নদীর পাড় ঘুরে দেখা যায়, নদীর আসল মাছের দেখা মেলা ভার। আড়তগুলো মূলত সয়লাব পুকুরে চাষ করা রুই, কাতল, তেলাপিয়া, কৈ ও পাবদা মাছে। সামান্য কিছু নদীর মাছ মিললেও দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। বাজারে প্রতি কেজি পাঙ্গাস বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকায়, আর বাঘাইড় বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ১,০২০ টাকা পর্যন্ত।
যদিও গত বছর গোদাগাড়ীর হরিশংকরপুর ঘাটে জেলে হবি, দুরুল, মান্নান ও খোশ মোহাম্মদের জালে ধরা পড়েছিল ৭১ কেজি ওজনের একটি বিশালাকার বাঘাইড়, যা ৬৮ হাজার ৮৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল—এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা এখন আর নিয়মিত ঘটে না।
পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা:-
বাপ-দাদার আমল থেকেই পদ্মায় জাল বেয়ে সংসার চালিয়ে আসছেন গোদাগাড়ীর মাটিকাটা ইউনিয়নের প্রবীণ জেলে হবি ও দুরুল। হতাশা প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘শৈশব থেকেই পদ্মায় মাছ শিকার করে আসছি। আগে যেখানে জালে মণকে মণ মাছ উঠত, এখন তা কেবল কেজিতে নেমে এসেছে। সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই এই পৈত্রিক পেশা ছেড়ে কৃষিশ্রমিক বা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। উজান থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, নদীতে নিয়মিত ড্রেজিং করে নাব্য ফিরিয়ে আনা, অভয়াশ্রম রক্ষা এবং কৃষিতে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে পদ্মার ঐতিহ্যবাহী মাছ ও নদীকেন্দ্রিক জনপদ।