‘স্যরি’ বললেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়
‘তোমার আমার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত!’ কেউ আপনাকে কষ্ট দিলে বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে কখনো কি তাকে এ কথা বলেছেন? কিন্তু ‘আমি দুঃখিত’ শুনলে কি সত্যিই কষ্ট কমে? এতে তো ঘটে যাওয়া ঘটনা বদলানো যায় না। তাহলে ক্ষমা চাওয়ার গুরুত্ব কোথায়?
গবেষণা বলছে, আমরা শুধু অনুশোচনা নয়, অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে নিজের কাজের দায় স্বীকার এবং আমাদের কষ্ট বোঝার প্রত্যাশা করি। আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা মানে শুধু ‘দুঃখিত’ বলা নয়, বরং ভুল স্বীকার করে তার দায় নেওয়া।
কিন্তু নিজের কাজের দায় স্বীকার করা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
দুই পক্ষের উপলব্ধির ব্যবধান
আমরা সাধারণত অন্যদের কাছ থেকে খারাপ আচরণ আশা করি না। তাই কোনো বন্ধু শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বাতিল করলে মনে হতে পারে, সে আমাদের বা আমাদের সময়কে গুরুত্ব দেয় না। এমনকি নিজের কোনো ভুলের কারণে এমন হয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ জাগতে পারে। এবার ভাবুন, বন্ধু শুধু ‘দুঃখিত’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে গেল। তখন মনে হতে পারে, সে আপনার কষ্ট বুঝতে পারছে না বা আপনার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমাইস্টার ১৯৯৭ সালে এই পার্থক্যকে ‘ম্যাগনিটিউড গ্যাপ’ বা ঘটনার গুরুত্ব সম্পর্কে উপলব্ধির ব্যবধান হিসেবে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ যিনি কষ্ট পান, তার কাছে ঘটনাটি যতটা গুরুতর, যিনি কষ্ট দেন, তার কাছে তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে।
এই ব্যবধানের কারণে ক্ষমা চেয়েও সব সময় সমস্যার সমাধান হয় না। কষ্ট পাওয়া ব্যক্তি চান তার অনুভূতির স্বীকৃতি ও আশ্বাস। অন্যদিকে যিনি কষ্ট দিয়েছেন, তিনি হয়তো নিজের দোষ কম দেখাতে বা অন্যের রাগ এড়াতে চান। সম্পর্কের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এই ব্যবধান কমানো জরুরি। গবেষণা বলছে, আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনায় শুধু ‘আমি দুঃখিত’ বলার চেয়ে ভুল স্বীকার ও অন্যের কষ্ট বোঝার গুরুত্ব বেশি।
ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা আসলে কী চাই?
২০০৬ সালে মনোবিজ্ঞানী জুডি ইটন ও তার সহকর্মীরা পরীক্ষা করেন, অন্যের অনুভূতির স্বীকৃতি পেলে ক্ষমা করার আগ্রহ বাড়ে কি না। তারা একটি অনলাইন খেলার আয়োজন করেন। এতে প্রতিপক্ষ অন্যায্য আচরণ করে অংশগ্রহণকারীদের হারিয়ে দেন। এরপর প্রতিপক্ষ চার ধরনের বার্তার একটি দেন-শুধু ক্ষমা চাওয়া, অন্যায় স্বীকার করা, দুটিই করা অথবা কিছুই না বলা।
গবেষকেরা দেখেন, প্রতিপক্ষ কিছু না বললে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অনুভূতির স্বীকৃতি কম পেয়েছেন বলে মনে করেন এবং ক্ষমা করতেও কম আগ্রহী হন। শুধু ‘আমি দুঃখিত’ বললেও তেমন লাভ হয়নি। বরং অন্যায় আচরণ স্বীকার করলে তারা বেশি স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে মনে করেন এবং ক্ষমা করার আগ্রহও বেড়েছে।
আশ্চর্যের বিষয়, শুধু অন্যায় স্বীকার করাও ক্ষমা চাওয়া ও অন্যায় স্বীকার-দুটির সম্মিলিত বক্তব্যের মতোই কার্যকর ছিল। এর কারণ অন্যায় স্বীকার করলে দুই পক্ষের মধ্যে ঘটনা সম্পর্কে একটি অভিন্ন উপলব্ধি তৈরি হয়। তাই ‘তুমি কষ্ট পেয়েছ বলে দুঃখিত’ বা ‘যদি তোমাকে কষ্ট দিয়ে থাকি, তবে দুঃখিত’ এ ধরনের কথা খুব একটা কার্যকর হয় না। এতে কষ্ট দেওয়ার দায় স্বীকার করা হয় না। বরং কেন অন্য ব্যক্তি কষ্ট পেয়েছেন, তা বুঝতে পারার স্বীকৃতি দেওয়াই ক্ষমা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
ক্ষমা চাওয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি প্রায়ই বাদ পড়ে
কার্যকর ক্ষমা প্রার্থনার জন্য শুধু ‘আমি দুঃখিত’ বলাই যথেষ্ট নয়। নিজের ভুল স্বীকার করা এবং অন্যের কষ্ট বোঝাও জরুরি। এতে দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সম্পর্কের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। তবে গুরুতর ক্ষতির ক্ষেত্রে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে আন্তরিক অনুশোচনা, ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ও আচরণে পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ক্ষমা চাইলে শুধু নিজের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ নয়, অন্য ব্যক্তি কেন কষ্ট পেয়েছেন, তা বুঝতে হবে। আর ক্ষমা প্রত্যাশা করলে ভাবুন, আপনি কি শুধু ‘দুঃখিত’ শুনতে চান, নাকি নিজের কষ্টের স্বীকৃতিও চান?
সূত্র: সাইকোলজি টুডে