লাগামহীন দফায় দফায় এলপিজি’র দাম বৃদ্ধিতে বেসামাল সাধারণ মানুষ
মাসের শুরুতেই ফের বাড়ল বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দফায় দফায় নতুন দর ঘোষণা করলেও তা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বাস্তবে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। ফলে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে রাজশাহী মহানগরীসহ সারাদেশেই রান্নার খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ।
রাজশাহী নগরীর কাদিরগঞ্জে অবস্থিত যমুনা গ্যাস ডিপোসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা যায় গ্রাহকদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে কম গ্যাস কিনছেন। এলপিজির এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
সাধারণ ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিন-
চারজনের পরিবারের পেছনে গ্যাস বাবদ খরচ এখন লাগামহীন। ১৮০০ টাকার দর যখন কাগজে-কলমে ছিল, তখনই কিনতে হতো ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায়। এখন সরকারি দর দুই হাজার টাকা পার হওয়ায় খুচরা বাজারে তা আড়াই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরীর উপশহর এলাকার গৃহিণী ফাতেমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সংসারের বাজেট সামলাতে গিয়ে এখন দিশেহারা অবস্থা। চাল, ডাল, তেল—সবকিছুরই তো দাম চড়া। এর ওপর গ্যাসের দাম যেভাবে দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে, তাতে চলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্বামী যা আয় করেন, তার বড় অংশই এখন গ্যাস কিনতে চলে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে এখন ডালের পরিবর্তে পাতলা ঝোল রান্না করতে হচ্ছে বা কাঠের চুলা ব্যবহারের কথা ভাবছি।
নগরীর সাহেব বাজার এলাকার একটি ছোট রেস্তোরাঁর মালিক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি মারার জোগাড় হয়েছে। দোকানে দিনে অন্তত দুইটা সিলিন্ডার লাগে। পাইকাররা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে দাম রাখছে। এই বাড়তি দামে গ্যাস কিনে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। হয় খাবারের দাম দ্বিগুণ বাড়াতে হবে, নয়তো দোকান বন্ধ করে দিতে হবে।
সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার নতুন দাম ঘোষণা করা হয়, যা ওই দিন রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে। সংস্থাটি গত মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১,৮৩৭ টাকা, যা বর্তমানে ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২,০৬০ টাকা করা হয়েছে।
তবে বিইআরসির এই দর নির্ধারণ বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় দেড় মাস ধরেই বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছিল ২,২০০ থেকে ২,৩০০ টাকায়। বিইআরসি নতুন করে সরকারি দর বাড়ানোয় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে দ্বিগুণ এবং খুচরা মূল্য আড়াই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহীর একাধিক বাসাবাড়ির ব্যবহারকারী এবং ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার দর বাড়ামাত্রই বিক্রেতারা মুহূর্তের মধ্যে বাজার থেকে বাড়তি টাকা আদায় শুরু করেন। একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, চাল, ডাল, ময়দা ইত্যাদির দাম আগেই বাড়তি ছিল; তার ওপর প্রতিনিয়ত গ্যাসের দাম বাড়ায় রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। লোকসান এড়াতে হয় খাবারের দাম বাড়াতে হবে, নয়তো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে।
অন্যদিকে, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের দাবি ভিন্ন। কাদিরগঞ্জ এলাকার সিলিন্ডার বিক্রেতা আব্দুল জব্বার বলেন, "আমরা ইচ্ছা করে বেশি দাম নিচ্ছি না। পাইকারি পর্যায় থেকেই আমাদের বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। তাছাড়া বাজারে রয়েছে তীব্র সরবরাহ সংকট।
তারা আরো বলেন, কোম্পানিগুলো আমাদের যে রেটে দেয়, তার সঙ্গে পরিবহন খরচ যোগ করে সামান্য লাভে বিক্রি করতে হয়। বিইআরসির নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করা আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। বেশি দামে গ্যাস কেনার কারণে বাধ্য হয়েই ক্রেতাদের কাছে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, যা নিয়ে প্রতিদিন গ্রাহকদের সঙ্গে আমাদের বচসা ও বাকবিতণ্ডা তৈরি হচ্ছে।
নগরীর আরেক খুচরা বিক্রেতা প্রদীপ কুমার সাহা জানান, "ডিলার পয়েন্ট থেকেই আমাদের বলা হয় গ্যাস কম আসছে। বেশি দামে না আনলে দোকানে মালই পাওয়া যায় না। সরকার যদি সত্যিই নির্ধারিত দামে গ্যাস দিতে চায়, তবে আগে ডিলার ও কোম্পানির সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।"
ভোক্তাসাধারণ ও সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল বিইআরসির পক্ষ থেকে দাম নির্ধারণ করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নির্ধারিত দামে বাজারে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে তদারকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এলপিজি গ্যাসের এই লাগামহীন দর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে।