তানোরে ডিপের ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত ১॥ বছরজুড়ে চুরির মহোৎসবে দিশেহারা কৃষকরা
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় গভীর নলকূপের (ডিপ টিউবওয়েল) ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক চোর নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
গত ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে উপজেলার কৃষ্ণপুর কচুয়া বড়তলা এলাকার জামিলের দিঘির মোড় সংলগ্ন একটি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) ডিপ টিউবওয়েল পয়েন্টে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
এদিকে এই বিচ্ছিন্ন ঘটনার আড়ালে উন্মোচিত হয়েছে এক ভয়াবহ চিত্র। তানোর উপজেলায় চলতি বছরে ট্রান্সফরমার চুরির হিড়িক পড়েছে। একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের খেটে খাওয়া কৃষকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে কৃষ্ণপুর কচুয়া বড়তলা এলাকার জামিলের দিঘির কাছের ওই ডিপ টিউবওয়েলটির সংযোগ ঘরের (পাম্প হাউস) ওপরের অংশ বা খুঁটি বেয়ে ট্রান্সফরমারের ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা চালায় এক চোরচক্রের সদস্য। রাতের আঁধারে অসাবধানতাবশত লাইভ লাইনে হাত পড়ে যাওয়ায় সে ঘটনাস্থলেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। পরদিন সকালে স্থানীয় কৃষকরা ডিপে গিয়ে মরদেহটি দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে তানোর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
তানোর উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন চুরির ঘটনা নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ধারাবাহিক অপরাধের অংশ।
গত এক বছরে (২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে চলতি নভেম্বর পর্যন্ত) তানোর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন—বিশেষ করে বাধাইড়, কলমা, চাঁন্দুড়িয়া, সরনতাই ও তানোর সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে অবস্থিত অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি ডিপ টিউবওয়েলের ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, গভীর রাতে সংঘবদ্ধ চোরচক্র পিকআপ ভ্যান বা ইজিবাইক নিয়ে এসে অত্যন্ত সুকৌশলে খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার নামিয়ে কপার বা তামা এবং মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যায়। অনেক সময় রাতের বেলা পাহারা দেওয়ার লোক না থাকায় অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ও আমন ধান চাষের জন্য গভীর নলকূপের পানিই একমাত্র ভরসা। কিন্তু এই ট্রান্সফরমার চুরির কারণে কৃষকদের ওপর নেমে এসেছে অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল মজিদ আক্ষেপ করে বলেন, "একটা ট্রান্সফরমার চুরি হলে নতুন করে লাগাতে বিএমডিএ বা স্থানীয়ভাবে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়া নতুন ট্রান্সফরমার পেতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লেগে যায়। এই সময়ে পানি সেচ দিতে না পেরে আমাদের ক্ষেতের ফসল মাঠেই শুকিয়ে মরে যাওয়ার উপক্রম হয়। চোরেরা আমাদের পেটে লাথি মারছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত এক বছরে ট্রান্সফরমার চুরির কারণে তানোরের কৃষকদের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ওপরে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সেচ বন্ধ থাকায় উৎপাদনে বিলম্ব ও অতিরিক্ত খরচের বোঝা। চুরির ভয়ে অনেক এলাকায় কৃষকদের রাতে মাঠে পালা করে পাহারা দিতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
কৃষ্ণপুর এলাকার প্রবীণ কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, "রাতে মাঠে পাহারা দেওয়া আমাদের জন্য কষ্টকর। পুলিশ প্রশাসন যদি রাতে নিয়মিত টহল দিত, তবে এই চোরদের দৌরাত্ম্য কমত। আমরা রাতের আঁধারে চোরদের ধরে পুলিশে দিলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে তারা আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ট্রান্সফরমার চুরির সাথে স্থানীয় কোনো অসাধু চক্র বা স্ক্র্যাপ (ভাঙারি) ব্যবসায়ীরা সরাসরি জড়িত থাকতে পারে। চোরাই তামা ও লোহা কোথায় বিক্রি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে এসব সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটন করা জরুরি।
এ বিষয়ে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, "কৃষ্ণপুর এলাকায় ডিপের ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে এক ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি। মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এছাড়া সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাগুলো রোধে পুলিশি নজরদারি ও রাতের টহল জোরদার করা হয়েছে।
কৃষকদের বাঁচানো এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে দ্রুত এই চোর চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা তানোরের সাধারণ কৃষকদের।