আবাদ কমলেও দাম বাড়েনি আলুর
চলতি মৌসুমেও উত্তরাঞ্চলে আলুর দামে ধস নেমেছে। গত ডিসেম্বর থেকেই বাজারে আসছে আগামজাতের নতুন আলু। প্রথম দিকে খুচরা বাজারে ২০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও মোকামে আমদানি বাড়ায় বর্তমানে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলিতে আলু বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে। কৃষকরা বলছেন, গত মৌসুমের বিপুল আর্থিক লোকসান মাথায় নিয়েই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে এবারও আলু চাষ করেছিলেন তারা। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো হেরফের হয়নি। উত্তরাঞ্চলের বড় মোকামগুলিতে পাইকারিতে আলু বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা মণ দরে। গড়ে কেজিতে এই দাম ১০ থেকে ১২ টাকা। অথচ এক কেজি আলু উৎপাদনে এবার তাদের খরচ হয়েছে ১৫ থেকে ১৮ টাকা। কৃষকেরা আরো বলছেন ঈদুল ফিতরের পর ব্যাপকভাবে আলু তোলা শুরু হবে জমি থেকে। তখন দাম আরো কমার আশঙ্কায় ভুগছেন হাজারো চাষি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত মৌসুমে দেশে এক কোটি ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ আলুর চাহিদা ছিল ৮০ থেকে ৮৫ লাখ টন। ফলে প্রায় ৪৫ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত হয়। এ বিপুল পরিমাণ আলুর বেশির ভাগই এখনো অবিক্রীত রয়ে গেছে। পড়ে রয়েছে হিমাগারে। গত মৌসুমের বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণে চলতি মৌসুমে কৃষকেরা আলুর আবাদ কমিয়ে দিলেও দামের কোনো হেরফের না হওয়ায় একই হতাশায় ডুবছে তারা। আলু উত্তরের কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে আরো জানা গেছে, দেশে সর্বাধিক আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলি হলো রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট ও মুন্সীগঞ্জ। দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে প্রায় ৯০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। বাকি আলু উৎপাদিত হয় দেশের বাকি জেলাগুলোতে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আলু চাষ কমেছে। গত মৌসুমে জেলায় ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছিল। এই পরিমাণ জমি থেকে প্রায় ১০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে আবাদ কমে হয়েছে ২৩ হাজার হেক্টরে। আলু আবাদ কমেছে ছয় হাজার হেক্টরে। রাজশাহী জেলায় এবার আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে সাত লাখ টন।
আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রাজশাহীর চার জেলা রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলাতে চলতি মৌসুমে গত মৌসুমের তুলনায় ২৫ ভাগ জমিতে আলু আবাদ কমেছে। গত মৌসুমে এ চার জেলায় আলু উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ১৮ লাখ টন। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় আলু ফলেছিল প্রায় ৪২ লাখ টন। চার জেলায় এবার আলু ফলনের লক্ষ্যমাত্রা চার লাখ টন কমেছে। চলতি মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ৩২ লাখ টন আলু ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তরের রংপুর অঞ্চলের জেলাগুলোতে চলতি মৌসুমে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদ কমেছে। রংপুর কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন কম হবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, গত মৌসুমে কৃষকেরা আলু আবাদ করে কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে আর্থিক ক্ষতি কমাতে কৃষকেরা এবার আলু আবাদ কমিয়েছেন। এখনো পুরোদমে আলু তোলা শুরু হয়নি।
কৃষি কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, আলু আবাদ কমালেও দামে কোনো হেরফের হয়নি এবারও। কিন্তু এখনো পাইকারি বাজারে আলুর কেজি ১০ থেকে ১২ টাকার বেশি ওঠেনি। খুচরা বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৫ টাকা কেজি দরে। গ্রাম মহল্লায় বিক্রি হচ্ছে ১৬ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে। পুরোদমে আলু তোলা শুরু হলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি বিভাগ ও কৃষকরা।
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় সর্বাধিক আলু উৎপাদিত হয়। গত বছর তানোরের শত শত চাষি বিপুল আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন আলু চাষ করে। গত বছরের অনেক আলু এখনো হিমাগারগুলিতেই পড়ে নষ্ট হচ্ছে। তানোরের লালপুরের আলু চাষি শরিফুল ইসলাম জানান, গত বছর ৬ বিঘা আলু চাষ করে চার লাখ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবারও ছয় বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন। আলু আবাদের খরচ গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হয়েছে। কিন্তু বর্তমান নতুন আলু বাজারে উঠলেও দাম হতাশাজনক। রাজশাহীর তানোরসহ আশপাশের এলাকায় জমিতে আলু বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা মন দরে। ভালো মানের আলু বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ টাকা মনে। কেজিতে পড়ে আট টাকার কাছাকাছি। এই দামে আলু বেচে কিছুই থাকছে না কৃষকের। অথচ এক কেজির উৎপাদন খরচ ১৪ টাকার বেশি।
নওগাঁর নিয়ামতপুরের দামকুড়া গ্রামের চাষি দুরুল হোদা জানান, চার বিঘাতে আগামজাতের আলু আবাদ করেছিলেন। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ আলু তোলা শুরু করেন। ওই সময় কেজিতে ১২ থেকে ১৬ টাকা করে পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন দাম আরও কমে আট থেকে ১০ টাকায় নেমেছে। এখন আবাদের খরচটাই উঠছে না। পরপর দুই বছর আলু আবাদে লোকসান হলে আগামী বছর কৃষকেরা হয়তো আর আলু আবাদই করবেন না-বলেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৪ টাকা করে। তার ওপর জমি থেকে আলু তোলা, পরিবহণে করে হিমাগারে নেওয়া মিলিয়ে আরও তিন টাকা করে কেজিতে যোগ হবে। আলুর প্রতি কেজি হিমাগার ভাড়া আট টাকা। ফলে আলু বিক্রি করে দু’টাকাও ঘরে তুলতে পারবেন না চাষিরা। বাগমারার শিকদারি গ্রামের চাষি জমির উদ্দিন প্রামাণিক বলছিলেন, গত বছর বিদেশে আলু রপ্তানির পরিমাণ সামান্যই ছিল। এখন ইরানে যুদ্ধ চলছে। এ বছরও আলু রপ্তানি বন্ধ আছে। আর আলু চাষ করব কিনা তা ভাবতে হবে। আলু চাষ করে ফতুর হচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহিন মিয়া জানান, গত বছর আলুর দাম কম পেয়েছেন কৃষকরা। এবার উত্তরাঞ্চলে আলু আবাদ কমেছে। পুরোদমে আলু তোলা শুরু হলে বোঝা যাবে আলুর দাম কেমন হবে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে আলু আবাদ হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে। এর ফলে কৃষকরা আলুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আলুর বহুমুখী ব্যবহার ও বিদেশে রপ্তানি বাড়াতে পারলে আলু হতে পারে সম্ভাবনাময় অর্থকরী কৃষি পণ্য। সরকার সেই চেষ্টা করছে।