"মা" দিবস,২০২৬
“অনন্ত যামিনীতেও
যে সুখে-দুঃখে, দোষে-গুণে স্বর্ণপ্রতিমার সমান,
তাহার অমর্যাদা করিব কী করে?”
“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”—এই বাক্যটি আমার কাছে শুধু মায়ের প্রার্থনা নয়, আজীবন লালিত স্বপ্ন এবং বাস্তবতার এক অমলিন চাওয়া-পাওয়া।
গঙ্গা, যমুনা, মেঘনা, পদ্মা যেমন বহমান স্রোতের গতিতে প্রবাহিত হয়, তেমনি মায়ের ভালোবাসাও নিরন্তর বহুরূপে, বহুগুণে প্রবাহমান।
বৈশাখী ঝড় যেমন সুবর্ণলতার ডালপালা তলিয়ে নিয়ে যায়, আবার নতুন করে স্বমহিমায় দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়, তেমনি পৃথিবীর সকল মা তাঁদের শত দুঃখ-কষ্ট, অভাব আর সংগ্রামের মাঝেও একটাই স্বপ্ন লালন করেন—
তাঁদের সন্তান যেন দুধে-ভাতে থাকে, সুখে থাকে, মানুষ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
আর এই পরম নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বলিদান পৃথিবীর সকল মায়ের মাতৃত্বকে বহুগুণ সুমহান করেছে।
আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থায় মায়েদের ভূমিকা এবং তাদের ঐশ্বর্যকে তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। তাদের অপরিসীম সম্ভাবনাকে অবচেতনে ইতিহাসের অতল গহ্বরে বিলীন করে দেওয়া হয়।
আমরা জাতি হিসেবে যেমন উদাসীন, তেমনি মাতৃত্বের বন্ধনকেও অবহেলা করি, যা সমাজ ও দেশের জন্য এক অশনিসংকেত।
আমরা মাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার পরেও তাদের পরিমার্জিত সংস্কার, পারিবারিক ও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, চলন-বলন এবং চাওয়া-পাওয়াকে অবমূল্যায়ন করি।
অথচ একজন মা শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি সমাজ ও জাতিসত্তার ভিত্তি। তার শ্রম, ত্যাগ, মমতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধই আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলে।
তাই আদিবাসী সমাজে মায়েদের যথাযথ সম্মান, মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিই না। যেখানে ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়ন করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে আমরা জাতি হিসেবে বরাবরই উদাসীন থেকে যাই।
মা সকল জাতি ও সকল সম্প্রদায়ের বর্তমান ও ভবিষ্যতের গৌরবময় ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
“মা” নামক যাদুর খনি—তাঁর অবদান, মায়া, মমতা, স্নেহ ও মাতৃত্বের বন্ধন—সবকিছুই গৌরবময় ইতিহাসের অংশ।
ইতিহাস যেমন একটি জাতির আগামী প্রজন্মের জ্ঞান, গরিমা ও সভ্যতাকে গতিশীল ও মহিমান্বিত করে,
তেমনি মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও অবদান একটি পরিবার, জাতি ও সমাজের সুমহান মর্যাদার ভিত্তি স্থাপন করে।
মায়ের ভাষা, পরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তাকে যারা অস্বীকার করে কিংবা ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে, তারা পক্ষান্তরে মায়ের অবদানকেই অস্বীকার করে।
ইদানীং আদিবাসী সমাজব্যবস্থায়, বিশেষ করে বেদিয়া জাতিসত্তার মানুষের মধ্যে বিভিন্নভাবে নিজেদের মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবার ও সমাজপ্রদত্ত সংস্কার এবং পদবি ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি কোনো জাতির জন্যই মঙ্গলজনক বা সুখকর হতে পারে না।
মা, মায়ের জীবনাচরণের আদর্শ, মায়ের মুখের ভাষা এবং মায়ের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ইতিহাসের এক মূল্যবান সম্পদ। তাই এগুলো কখনোই ভুলে গেলে চলবে না।
জেলে পাড়ার ঐ মজিবুর নৌকায় করে থাল বাঁজিয়ে কিংবা নদীপাড়ের লেচা, হয়তোবা আর সাতবিলায় মাছ ধরে জীবন নির্বাহ করতে আসবে না।
কিন্তু মায়ের দীর্ঘদিনের নিঃস্বার্থ পরিশ্রম, মায়ের মুখের ভাষা, পাওয়া-না-পাওয়ার অভিমান, বিভিন্ন উৎসব কিংবা পরবে ছেঁড়া শাড়িতে মানিয়ে নিয়ে পরম আনন্দে নেচে-গেয়ে সবার মন জয় করা—এই দুর্লভ সময়ের অতন্দ্র সাক্ষী যদি হারিয়ে যায়, তাহলে শত চেষ্টায় আর ফিরে পাওয়া খুব কঠিন হয়ে যাবে।
আসুন, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জয়যাত্রাকে আরও গতিশীল করি। মায়ের ভাষা, মায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামকে আমরা গভীরভাবে ধারণ, লালন ও পালন করি।
মায়ের ইচ্ছা ও স্বপ্ন জাতিসত্তার ইতিহাসের দর্পণে উজ্জ্বল রশ্মির মতো বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিফলিত হোক। মা দিবসে এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই।