বাড়ছে মানুষের মৃত্যুর মিছিল, মুল্যহীন মানুষ

worthless people
আবুল কালাম আজাদ ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৯ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৯ অপরাহ্ন
বাড়ছে মানুষের মৃত্যুর মিছিল, মুল্যহীন মানুষ
--সংগৃহীত ছবি

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।পৃথিবীর মায়া ছিন্ন করে চলে যেতে হবে সবাইকে। এটাই নিয়তি।

কিন্তু প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ শেষে ঢাকা ফেরার পথে দৌলতদিয়ায় ফেরি থেকে পদ্মা নদীতে ডুবে যেভাবে বাসভর্তি মানুষের মৃত্যু হলো! তা মেনে নেওয়া কঠিন। এটা কেমন নিয়তি! এভাবে মৃত্যু সত্যি মেনে নেওয়া যায় না। ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিণতি। সীমাহীন অবহেলা, অসচেতনতা, দায়িত্বহীনতা, বিশৃঙ্খলা, অদক্ষতা, উদ্ধারে ধীরগতি, রাষ্ট্রের দুর্বল কাঠামো-মর্মান্তিক এই বাস দুর্ঘটনা একসাথে সবকিছু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। যদিও আমাদের তাতে কিছু যায় আসে না। দু-একদিন সমালোচনা করেই থেমে যাবো। আবারও আমরা একইভাবে চলবো। কারণ, নিয়ম না মানলেতো কোনও শাস্তি হয় না। আর হলেও তা গায়ে লাগে না।

বাস-ট্রেন-নৌপথ-সবখানে শুধু মৃত্যুর মিছিল। মৃত্যু এতোটাই সহজ হয়ে গিয়েছে-যা ধারণারও বাইরে। মানুষের প্রাণের দাম এখনো হাজার টাকায় নেমে এসেছে। আর তালিকার বাইরে থাকলেতো মূল্যহীন! দরজায় দরজায় ঘুরেও মিলবে না মৃত্যুর দাম। যে দামে কারও স্ত্রী, সন্তানের পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া চলতে পারে। মেটাতে পারে কারও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ব্যয়। মৃত্যুর দাম দিতে পারে একটি পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা। এই আইনি দুর্বলতা ৫৫ বছরেও কাটেনি-আর কাটবে বলেও বিশ্বাস হয় না। হতাশ হতে হতে আমরা এখন অবিশ্বাসের চোরাবালিতে আটকে গেছি। যেখান থেকে পরিত্রাণের আর কোন উপায় আছে বলে মনে হয় না।

পত্রপত্রিকায়  ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানাগেছে,

রাজবাড়ী:-

২৬ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাস ডুবে মারা গেছেন ২৬ জন।

নেত্রকোনার মদন উপজেলায় বোরো ধানের জমিতে গরু ঢুকে ধান খাওয়ার প্রতিবাদ করায় বাচ্চু তালুকদার (৬০) নামের এক কৃষককে পিটিয়ে হত্যা। 

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার নায়েকপুর হাওরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

খাগড়াছড়ির

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেলে, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় যাত্রীবাহী বাস ও থ্রি-হুইলার মাহিন্দ্রর মুখোমুখি সংঘর্ষে এক শিক্ষক নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় ওই বিদ্যালয়েরই আরও পাঁচ শিক্ষক আহত হয়েছেন।

কুমিল্লা

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কালাকচুয়া এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় প্রাইভেট কারের চালকসহ ৫ জন নিহত। 

১৮ মার্চ বগুড়ার সান্তাহারে ট্রেন দূর ঘটনায় ৬৬ জনের মত গুরুতর আহত হয়েছে।

কুমিল্লা:-

২১ মার্চ কুমিল্লায় পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে ট্রেনের ধাক্কায় অন্তত ১২জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও অনেকেই আহত হয়েছেন।

ফেনী :-

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন নিহত  হয়েছেন। এতে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। রোববার (২২ মার্চ) ভোর ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। 

 জামালপুর:-

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ভাসমান সেতু ভেঙে ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটিতে অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘটেছে এই দুর্ঘটনা। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিএনপি নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনগণ। 

শনিবার (২১ মার্চ) ঈদুল ফিতরের দিন বিকেল ৪টার দিকে দেওয়ানগঞ্জ থানার সামনে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

নাটোর :-

নাটোরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নাঈম হোসেন নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। 

শনিবার (২১ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নাটোর সদর উপজেলার একডালা শান্তি ফিলিং স্টেশনের সামনে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

চুয়াডাঙ্গায় :-

পূর্ববিরোধের জেরে ঈদের নামাজ শেষে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নারীসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।

শনিবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় ডাউকি ইউনিয়নের ছত্রপাড়া গ্রামে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। 

চট্রগ্রাম:-

শনিবার (২১ মার্চ) দুপুরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া বাইপাসের পাইকপাড়া পয়েন্টে যাত্রীবাহী বাস উল্টে মোহাম্মদ কাশেম (৩৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত আরও ২৫ জন।

বগুড়া :-

শুক্রবার (২০ জানুয়ারি) রাতে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় বোনের বাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে এসে প্রতিপক্ষের নৃশংস হামলায় উম্মে হাবিবা উর্মি (৩২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। 

ময়মনসিংহ: 

ময়মনসিংহের তারাকান্দায় গতকাল সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ দুজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন দুজন। 

নড়াইল:

 নড়াইল সদর উপজেলায় মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। নিহত তরুণের নাম রাব্বী মোল্যা (২০)। তিনি নড়াইল পৌরসভার রঘুনাথপুর এলাকার পান্নু মোল্যার ছেলে।

ঝিনাইদহ:

 ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নগরবাথান এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আব্দুল গফুর নামের সপ্তম শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। নিহত আব্দুল গফুর হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভায়না ইউনিয়নের বাগআঁচড়া গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে।

মাদারীপুর: শিবচরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মো. শাহাদাত খলিফা (১৫) নামের এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। নিহত শাহাদাত শিবচর উপজেলার দ্বিতীয়াখণ্ড নিয়ামতকান্দি গ্রামের হিরু খলিফার ছেলে। 

ফরিদপুর: 

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার বানায় ঈদের দিন মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেরিয়ে জিহাদ শেখ (১৬) নামে এক কিশোর নিহত হয়েছে। নিহত জিহাদ শেখ উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের জয়দেবপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান শেখের ছেলে।

গোপালগঞ্জ: গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক বিদ্যুৎ কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে।  তিনি উপজেলার টুপুরিয়া গ্রামের মোকসেদ আলী শেখের ছেলে।

 আর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৬-০৩-২৬ তারিখ পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় আড়াইশতের মত। এক একটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; একটি স্বপ্নের অবেলায় ঝরে যাওয়া। যেন আকাশে জ্বলজ্বল করা এক একটি তারার করুণ পরিসমাপ্তি। মহাকালে হারিয়ে যাওয়া। যেখান থেকে আর কোনদিন ফেরা হবে না কারও! বাবা বা মাকে পাওয়ার জন্য যতই কাদুক সন্তান, অথবা প্রিয় সন্তানকে পাওয়ার জন্য বাবা-মা। স্বামীকে পাওয়ার জন্য স্ত্রী অথবা স্ত্রীকে পাওয়ার জন্য স্বামী। ভাইকে পাওয়ার জন্য বোন অথবা বোনকে পাওয়ার জন্য ভাই। কান্নার আকুতি পৌঁছাবে না ভিন গ্রহে। যেখানে হারিয়ে যাওয়া তারাদের মেলা বসে!

সবশেষ দৌলতদিয়ায় বাস ডুবির ঘটনায় ৬ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন কমা দেবে কমিটি। কিছু সুপারিশও পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবায়ন সেতো পদ্মা নদীর ৩০ ফিট গভীরে থেকে যাবে! পদ্মাপাড়ে প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের কান্না শেষ হবে না। তাদের আহাজারি আর শুনবে না সরকার। মিলবে না প্রাণের দামও। এটা আমি হলফ করেই বলতে পারি। আমার এই কথা যেন মিথ্যে প্রমাণিত হয়। খুব খুশি হবো সেদিন, যেদিন শুনবো অপেক্ষায় থাকা স্বজনরা তাদের প্রিয়জনের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছে। ক্ষতিপূরণ পেয়েছে সবাই। পদ্মাপাড়ে বসে নেই কোন স্বজন। নেই কোন আহাজারি;অরণ্যেরোদন!

আশা করাটাই যেন দুরাশা। তারপরও আশায় বুক বাঁধি। সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা যেন আর দেখতে না হয়। মৃত্যুর সংখ্যা শূণ্যে নেমে আসুক। মৃত্যুকে যেন আর দাম দিয়ে কিনতে না হয়! এজন্য সরকার ও জনগণ সজাগ হোক। কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা বা কাঠামো গড়ে তুলুক সরকার। চালকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। বাধ্যতামূলক করা হোক রেস্ট পয়েন্ট ও ড্রাগ টেস্ট। মহাসড়কে যুক্ত করা হোক স্পিডোমিটার। মহাসড়কে জোরদার করা হোক পুলিশি মনিটরিং। একইভাবে নৌপথে নিশ্চিত করতে হবে লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা অনুসারে টিকিট বিক্রি, অতিরিক্ত যাত্রী উঠালে জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ। রেলপথে শিডিউল ঠিক রাখা, অতিরিক্ত ট্রেন চালু, রেলক্রসিংগুলো শতভাগ নিরাপদ রাখা, মানসম্মত খাবার, বদলি চালক এবং অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থা আরও সহজ করতে হবে। দূর করতে হবে সার্ভার জটিলতা। তিনপথেই বাড়াতে হবে সিসিটিভি নজরদারি।

যাত্রীদের সেবার মানে কোন আপোষ নয়। অবহেলা বা বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ কোটি টাকার নিচে করা যাবে না। কারণ রাষ্ট্রকেই এই দায় নিতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ যাত্রা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর নাগরিক হিসেবে আপনাকে-আমাকে আরও সচেতন হতে হবে। কারণ, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অবহেলা বা বিশৃঙ্খলা দেখলেই প্রতিবাদ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে হবে। এজন্য নাগরিক সেবায় শর্টকোড চালু করা এখন সময়ের দাবি।