৮০০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ, বাম্পার ফলনের আশা কৃষকদের
মেহেরপুরে দিনদিন বাড়ছে লিচুর আবাদ। রসালো, সুস্বাদু ও উচ্চ বাজারমূল্যের কারণে ফলটি এখন জেলার কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছরই লিচুর বাগানের পরিধি বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদন ও বাজার চাহিদা। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন বাগানে পরিচর্যার কাজ শেষ পর্যায়ে। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই বাজারে উঠতে শুরু করবে সুস্বাদু লিচু।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর জেলায় প্রায় ৭১৫ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছিল। সেখান থেকে উৎপাদিত হয় প্রায় ৬ হাজার ১১০ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ছিল ৫০ কোটিরও বেশি। এ বছর সেই আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০০ হেক্টরে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছে গাছে লিচুর গুটি ভালো এসেছে, যা চাষিদের মধ্যে বাম্পার ফলনের আশা জাগিয়েছে।
জেলার প্রায় প্রতিটি লিচু বাগানেই এখন দেখা যাচ্ছে থোকায় থোকায় সবুজ লিচু। বাগানজুড়ে চলছে পরিচর্যা, সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং পোকামাকড় দমনের কাজ। চাষিরা বলছেন, এ বছর আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় ফলনের সম্ভাবনা খুবই ভালো। তবে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবং বাজারদর সন্তোষজনক থাকলে তারা কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখতে পারবেন।
মেহেরপুরে চায়না থ্রি, বেদানা, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাঁঠালি ও আঠি জাতের লিচুর চাষ বেশি হচ্ছে। এর মধ্যে চায়না থ্রি ও বোম্বাই জাতের লিচুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এগুলো আকারে বড়, রসে ভরপুর এবং স্বাদে অতুলনীয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় মেহেরপুরের লিচুর বিশেষ কদর আছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চাষিরা জানান, লিচু চাষ এখন তাদের জন্য একটি লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
সদর উপজেলার বাগান মালিক সাইদুর রহমান বলেন, ‘লিচু চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকায় এ বছর ১ বিঘা জমিতে নতুন করে চারা রোপণ করেছি। পাশাপাশি ২ বিঘা জমির পুরোনো বাগানেও নিয়মিত পরিচর্যা করছি। আবহাওয়া ভালো থাকলে বাম্পার ফলনের আশা করছি।’
বাগান মালিক সুমন হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘লিচুর গুণগত মান ঠিক রাখতে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে নিয়মিত পরিচর্যা করছি। সময়মতো ওষুধ প্রয়োগ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হলে ফলন ভালো হয়।’
চাষি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘এ বছর আমার আড়াই বিঘা জমিতে লিচুর বাগান আছে। গত বছর মুকুল আসার সময়ই বাগান পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। এ বছর বেশি যত্ন নিচ্ছি। আশা করছি কয়েক লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে পারবো। তবে চাষিদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। বিশেষ করে দানা আসার পর বাদুড় ও পাখির উপদ্রব বেড়ে যায়। যা অনেক সময় ফলনের ক্ষতি করে। এ কারণে অনেক চাষি ঝুঁকি এড়াতে আগাম বিক্রি করে দেন।’
চাষি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পোকামাকড় দমনে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করছি। তবে ফল বড় হওয়ার পর বাদুড় ও পাখির আক্রমণ বাড়ে। তাই অনেক সময় আগাম বিক্রি করে দিতে হয়।’
লিচু ব্যবসায়ীরাও এরই মধ্যে মাঠে নেমেছেন। জেলার বিভিন্ন বাগানে আগাম চুক্তির মাধ্যমে লিচু কেনাবেচা শুরু হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী বাবুল হোসাইন বলেন, ‘এ বছর বাগানগুলোতে ভালো ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বাগান কিনেছি। মৌসুমজুড়ে আরও বাগান ও কাউন হিসেবে লিচু কেনা হবে। মেহেরপুরের লিচুর চাহিদা সব সময়ই বেশি থাকে।’
অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ব্যবসায়ীরা মেহেরপুরে আসছেন লিচুর বাগান কিনতে। ফরিদপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘মেহেরপুরের লিচুর মিষ্টতা ও স্বাদের কারণে চাহিদা বেশি। তাই আগেভাগেই বাগান কিনতে এখানে আছি। আশা করি এ বছর ভালো ব্যবসা হবে। দাম স্থিতিশীল থাকলে ব্যবসায়ী ও চাষি উভয়ই লাভবান হবেন।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ বছর লিচুর উৎপাদন ও বাজারমূল্য উভয়ই বাড়ার সম্ভাবনা আছে। এ প্রসঙ্গে উপ-পরিচালক সনজীব মৃধা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় গাছে লিচুর গুটি বেশি এসেছে। আশা করছি, প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হবে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যাতে তারা মানসম্মত লিচু উৎপাদন করতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘যদি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বিদেশে লিচুর বাজার তৈরি করতে পারে। তাহলে চাষিরা আরও বেশি লাভবান হবেন। রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
সব মিলিয়ে মেহেরপুরে লিচু চাষ এখন সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, বাড়তি আবাদ এবং বাজার চাহিদা—এ তিনের সমন্বয়ে এ বছর লিচুর বাম্পার ফলনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।