সবজি চাষের টাকায় কলেজছাত্রের স্বপ্নপূরণ
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দড়ি কুষ্টিয়া গ্রামের বাতাসে এখন ভাসে গোলাপের সুবাস। হোয়াইট অ্যাভাল্যান্স, লাল রঙের টপ সিক্রেট, হলুদ রঙের সোলারিয়া, সাদা-গোলাপীর মিশ্রণের জুমেলিয়াসহ দেশীয় নানা জাতের গোলাপ ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো বাগান। কোথাও গোলাপী, কোথাও ডার্ক মেরুণ, কমলা কিংবা গাঢ় গোলাপী রঙের দেশীয় গোলাপ। আছে চায়না গোলাপও।
এই গোলাপ বাগানের উদ্যোক্তা ময়মনসিংহ সদর উপজেলার কুষ্টিয়া ইউনিয়নের দড়ি কুষ্টিয়া গ্রামের মো. শামীম মিয়া (২৫)। তিনি মুক্তাগাছা শহীদ স্মৃতি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। কৃষক মো. সাহেব আলীর তিন ছেলের মধ্যে সবার বড় শামীম। পড়ালেখার পাশাপাশি মানুষের জমি বর্গা নিয়ে সবজি চাষ করে জমানো টাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের স্বপ্নের গোলাপ বাগান।
২০২৫ সালে বাড়ির পাশের ১০০ শতক জমি ১০ বছরের জন্য ৭ লাখ টাকায় লিজ নেন শামীম। এর মধ্যে ৫০ শতক জমিতে করেছেন ডাচ ও দেশীয় গোলাপের বাগান। পাশেই রয়েছে ১৯ শতকের ড্রাগন বাগান, ঘাস ও ভুট্টা খেত। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময় থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত শামীম দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যতিক্রম কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। সেই ভাবনা থেকেই গোলাপ বাগান করার উদ্যোগ নেন তিনি।
সম্প্রতি তার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, লাল, সাদা, গোলাপী, হলুদসহ নানা রঙের গোলাপে ভরে আছে পুরো এলাকা। চারপাশের সবুজের মধ্যে রঙিন ফুলগুলো যেন আলাদা এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি করেছে। বাগানে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার গাছ। যশোর ও ভারত থেকে চারা এনে গড়ে তোলা হয়েছে এই বাগান।
কথা হয় গোলাপ তুলতে ও বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত শামীম মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, এটা আমার স্বপ্নের বাগান। আমি ছোটবেলা থেকেই মানুষের জমি বর্গা নিয়ে কৃষি কাজ করে আসছি। দীর্ঘদিন কৃষি কাজ করায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করি ব্যতিক্রমি বড় ধরনের কিছু একটা করবো। আমাদের অঞ্চলে গোলাপ বাগান নেই কিন্তু গোলাপের নিয়মিত চাহিদা রয়েছে, সেই চিন্তা থেকে গোলাপ বাগানের পরিকল্পনা শুরু করি। আমার এক কৃষি অফিসার চাচাতো ভাইয়ের পরামর্শে জমি লিজ দিয়ে বাগান শুরু করেছি। ভারত ও যশোর থেকে চারা আনতেই আমার প্রায় তিনলাখ টাকা খরচ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাগান থেকে এখন তিন-চার দিন পরপর তিনশ থেকে পাঁচশ ফুল সংগ্রহ করে থাকি। প্রতি পিস ১০ টাকা করে বিক্রি হয়। ময়মনসিংহ, মুক্তাগাছার দোকানগুলো কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে ফুল বিক্রি হয়। আমার বাগানের নামে একটি ফেসবুক পেজ আছে, এর মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গা থেকে চাহিদা এলে ফুল পাঠিয়ে দিই। বিয়ে বা গায়ে হলুদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য তারা আমাদের অনলাইন পেজে নক দিয়ে থাকেন। ইতোমধ্যে ৫০ হাজার টাকার মতো ফুল বিক্রি হয়েছে। আশা করি, ভালো কিছু হবে।
নিজের স্বপ্ন নিয়ে শামীম বলেন, এলাকাকে বদলে দিতে পর্যটনকেন্দ্রের মতো গড়তে গোলাপ বাগানটি করেছি। আমি এই বাগান থেকে আসলে মূলত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই দেখছি। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছে, দেখছে ছবি তুলছে ও ফুল কিনে নিচ্ছে। আমি তরুণ একজন উদ্যোক্তা হিসেবে সবাইকে বলব চাকরি সোনার হরিণের মতো। আমার মতো উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করেন। তাহলে ভবিষ্যতে পেছনে তাকাতে হবে না।
বাগানটি এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। মুক্তাগাছার মহিষতারা এলাকা থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসেন মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, গোলাপ বাগানে আসতে খুব ভালো লাগে, তাই বন্ধুদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ঘুরতে আসি। এ ধরনের বাগান এ অঞ্চলে কোথাও নেই। বাগানে নানা রঙের ফুল দেখতে পারছি। এখানে আসতে কোনো টিকেট লাগে না।
ফুল বাগানে ঘুরতে এসে একগুচ্ছ ফুল কিনে নেন মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, এমন বাগান আমি কোথাও দেখিনি। ৮-৯ রঙের ফুল দেখেছি। ফুলকে কে-না ভালোবাসে। ফুল ঘরে রাখলে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ে, কাউকে গিফট দিলে তারাও খুশি হয়।
শামীমের বাবা মো. সাহেব আলী বলেন, প্রথম থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি কৃষিকাজে ছেলের ইচ্ছা ছিল। আমাদের পক্ষ থেকে যা যোগান লাগে তা দিয়ে যাচ্ছি। এখন জমি ভাড়া নিয়ে ফল-ফুলের বাগান করেছে। আশা করছি এই বাগান দিয়ে আমার ছেলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি হবে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুবায়রা বেগম সাথী বলেন, ময়মনসিংহ জেলায় এ ধরনের গোলাপ বাগান আর নেই। পড়ালেখার পাশাপাশি বাগানটি করেছে ওই তরুণ। আমাদের এ এলাকায় যে গোলাপ বাগান সম্ভব, তা করে দেখিয়েছে কলেজছাত্র। আমরা নিয়মিত তরুণ উদ্যোক্তার বাগান তদারকি করছি।
তিনি আরও বলেন, এই বাগান দেখে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তারাও এ ধরনের বাগান করতে চায়। আমরাও তাদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। তরুণরা চাইলে এ ধরনের গোলাপ বাগান করে সাফল্য অর্জন করতে পারে।