জামের রস যাচ্ছে বিদেশে, বিচিও ফেলনা নয়

Jam juice is going abroad
অনলাইন ডেস্ক ১৬ জুলাই ২০২৬ ০৭:৪৩ অপরাহ্ন কৃষি
অনলাইন ডেস্ক ১৬ জুলাই ২০২৬ ০৭:৪৩ অপরাহ্ন
জামের রস যাচ্ছে বিদেশে, বিচিও ফেলনা নয়
--সংগৃহীত ছবি

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি শহরের গায়ে মাখেনি। ঢাকার কারওয়ান বাজারে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে দিনের ব্যস্ততা। চোখে পড়ল বাঁশের ঝুড়িতে স্তূপ করে রাখা কালো-বেগুনি রঙের জাম। কোথাও মানুষ হাত দিয়ে বেছে নিচ্ছেন পাকা ফল, কোথাও পিষে বের হচ্ছে গাঢ় বেগুনি রস। কিছু দূরে চোখে পড়ে আরেক দৃশ্য—এক ঝুড়ি ভরা গোলাপি-রঙা বিচির স্তূপ। কাছে যেতেই বিষয়টা আরও পরিষ্কার হলো। সাজিয়ে রাখা হচ্ছে জামের রসের ব্যাগ, অন্যদিকে জমা হচ্ছে বিচি। যেন একটি ফলের দুই ভিন্ন পরিণতি। এসব জামের রস পাড়ি জমায় বিদেশে, আর বিচি থেকে যায় দেশের মাটিতে। তবে সেই বিচিও ফেলনা নয়; এরও গড়ে উঠেছে আলাদা বাজার।

বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল—রাজশাহী, নাটোর, যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর কিংবা পার্বত্য এলাকার বাগান থেকে ট্রাকভর্তি জাম আসে রাজধানীতে। অধিকাংশ মানুষের কাছে জাম মানে মৌসুমি ফল কিংবা রাস্তার পাশের শরবত। কিন্তু কারওয়ান বাজারের একটি অংশে এই ফলের আরেক পরিচয় আছে—এটি কাঁচামাল, এটি ব্যবসা, এটি শ্রমের ধারাবাহিকতা।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন এখানে ৮-১০ টন জাম আসে। এর একটি অংশ সরাসরি ফল হিসেবে বিক্রি হয়। তবে বাজারে বিক্রির পরেও প্রতিদিন কমবেশি প্রায় ২ টন জাম থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। সেই রস পরে বিভিন্ন জুস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, পাইকারি ব্যবসায়ী কিংবা রপ্তানিকারকদের কাছে পৌঁছে যায়।

কারওয়ান বাজারে চলে কর্মযজ্ঞ

শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে; তখন কারওয়ান বাজারে শুরু হয় আরেক দিনের প্রস্তুতি। এখানে সময় চলে ভিন্ন নিয়মে; শহরের ঘড়ি নয় বরং পণ্যের চাহিদাই সময় নির্ধারণ করে। ভোর চারটা থেকে শুরু হয় শ্রমের ব্যস্ত চিত্র। কারো কাজ ট্রাক থেকে ঝুড়ি নামানো, কারো কাজ জাম ধোয়া, কেউ ফল পিষে রস বের করছেন, কেউ আবার প্যাকেটজাত করছেন। দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা, কখনো রাত পর্যন্ত চলতে থাকে কর্মযজ্ঞ।

জামগুলো প্রথমে বাছাই করা হয়। ভালো ও পরিপক্ব ফল আলাদা করা হয়, নষ্ট বা অতিরিক্ত নরম ফল সরিয়ে রাখা হয়। এরপর ধোয়া, পিষে রস বের করা এবং ছাঁকনির কাজ সম্পন্ন হয়। রস আলাদা হওয়ার পর পড়ে থাকে বিচি ও শাঁসের অংশ। দেখা যায়, বেগুনি রঙে রঞ্জিত বিশাল ঝুড়িভর্তি বিচি। মনে হয় যেন কেউ রং ঢেলে দিয়েছে। অথচ এই রং তৈরি হয়েছে শত শত কেজি জাম পিষে। এই বিচির স্তূপ যেন বলে দেয়—একেক ব্যাগ রসের পেছনে কত ফলের দেহ নিঃশেষ হয়েছে।

বিদেশে যাচ্ছে রস

প্যাকেট করা গাঢ় বেগুনি রঙের রসের ব্যাগগুলো একের পর এক বাক্সে সাজানো হয়। ব্যবসায়ীদের ভাষায়, এসবের বড় অংশ চলে যায় জুস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা রপ্তানিকারকদের কাছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ফলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে। দেশি ফলের প্রতি প্রবাসীদের আবেগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের কাছেও জামের রসের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে মৌসুমি এ ফল এখন শুধু দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; প্রক্রিয়াজাত রূপে তা আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে।

বিচিও ফেলনা নয়, গড়ে বাণিজ্য

একসময় জামের বিচিকে অনেকেই বর্জ্য মনে করতেন। রস বের করার পর এগুলো ফেলে দেওয়া হতো বা নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, জামের বিচিও এখন বিক্রি হয়। বিচি শুকিয়ে গুঁড়ো বা পাউডার তৈরি করা হয়, যা দেশের বাজারে বেশ ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ভেষজ উপাদান হিসেবে জামের বিচির গুঁড়োর চাহিদা আছে। ফলে যে অংশ একসময় অবহেলিত ছিল; সেটিও এখন অর্থনৈতিক মূল্য পাচ্ছে। একটি ফলের প্রায় প্রতিটি অংশ থেকেই তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

শ্রমের রঙে রাঙা হাত

পুরো কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে নীরব অংশীদার শ্রমিকেরা। তাদের হাতেই ভোরের বাজার জেগে ওঠে। আবার তাদের হাতেই শেষ হয় দিনের কাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জামের কষে হাত-পা কালো হয়ে যায়। দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করতে করতে অনেকের শরীরে ক্লান্তি জমে। কিন্তু মৌসুমি এ কাজ অনেক শ্রমিকের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি করে।

একটি ঝুড়িভর্তি বিচির দিকে তাকালে মনে হয়, বাজারের ভেতর যেন আরেকটি অদৃশ্য গল্প পড়ে আছে। সেই গল্পে আছে শ্রমিকের রঙে রাঙা হাত, ভেজা মেঝে, দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কাজ করা মানুষ আর একটি ফলের রূপান্তরের ইতিহাস। আমরা যখন কোনো দোকান থেকে বোতলভর্তি জামের শরবত কিনি কিংবা বিদেশে পাঠানো ফলের সাফল্যের গল্প শুনি; তখন হয়তো এসব বিচির কথা মনে থাকে না। মনে থাকে না সেই শ্রমের কথাও, যা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কারওয়ান বাজারের গলিতে চলতেই থাকে।

জামের রস বিদেশে পৌঁছে যায় কিন্তু তার পেছনের মানুষগুলো খুব কমই পৌঁছান আলোচনায়। বিচির মতো তারাও অনেক সময় পড়ে থাকেন দৃশ্যের বাইরে। অথচ শহরের এই অদেখা কর্মযজ্ঞ টিকে আছে তাদের হাতেই।