শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে ৮ সাহাবি
শিশুদের প্রতি মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা ও কোমলতা ছিল অতুলনীয়। তিনি শিশুদের কোলে তুলে নিতেন, চুম্বন করতেন এবং তাদের আকস্মিক মৃত্যুতে অশ্রু বিসর্জন দিতেন। ইসলামের ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে অনেক শিশু নবীজির সান্নিধ্যে এসে অনন্য প্রতিভা ও নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেছিল।মাত্র দশ বছর বয়সে হজরত আলী ইবনে আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণ কিংবা অল্প বয়সে হজরত জায়েদ ইবনে সাবিতের ওহী লেখার দায়িত্ব লাভ এর অন্যতম উদাহরণ।
নবীজির সার্বক্ষণিক উৎসাহ, প্রতিভা লালন এবং সঠিক নির্দেশনায় এই শিশুরা পরবর্তীতে একেকজন খলীফা, সেনাপতি ও বিশ্ববরেণ্য হাদিস বিশারদে পরিণত হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংস্পর্শে ধন্য হয়েছেন এমন আটজন শিশু সাহাবির কথা তুলে ধরা হলো:
হজরত আলী ইবনে আবী তালিব
হজরত আলী ছিলেন নবীজির আপন চাচাতো ভাই। তার পিতা আবু তালিবের আর্থিক অসচ্ছলতা ও বড় সংসারের বোঝা কমাতে নবীজি আলীকে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন। শৈশব থেকেই আলী ছিলেন অসীম সাহসী। হিজরতের রাতে যখন কুরাইশ খুনিরা নবীজির বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল, তখন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি নবীজির বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন।
উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে বীরত্বের পর খায়বারের যুদ্ধে নবীজি তাকে ইসলামের পতাকা দেন এবং ঘোষণা করেন, আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা দেব, যাকে আল্লাহ ও তার রাসূল ভালোবাসেন এবং সেও আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসে। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অলঙ্কার শাস্ত্রের জন্য আলী (রা.) পরবর্তীতে ইসলামের চতুর্থ খলীফা হন এবং ৪০ হিজরীতে শাহাদাত বরণ করেন।
হজরত উসামা ইবনে জায়েদ
নবুওয়তের চতুর্থ বছরে মক্কায় জন্ম নেওয়া উসামা মুসলিম হিসেবেই বেড়ে ওঠেন। তার পিতা জায়েদ ইবনে হারিসা ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম সাহাবি। নবীজি উসামা ও হজরত হাসানকে একসাথে জড়িয়ে ধরে দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! তুমি তাদের ভালোবাসো, কারণ আমিও তাদের ভালোবাসি। নবীজির অত্যন্ত প্রিয় এই সাহাবী ৫৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর
নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছরে মাত্র সাত বছর বয়সে পিতা হজরত ইবনুল খাত্তাবের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন আবদুল্লাহ। সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসরণের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের অন্যতম হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ৭৩ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস
নবীজির আরেক চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হিজরতের তিন বছর আগে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তার মেধা ও শিষ্টাচার সবার নজর কেড়েছিল। নবীজি তার জন্য দ্বীনের গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনের বিশেষ দোয়া করেছিলেন। নবীজির ওফাতের সময় তার বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর। পরবর্তীতে ওমর ইবনুল খাত্তাব বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই তরুণ সাহাবির পরামর্শ নিতেন। কোরআন ও শরীয়তের অগাধ জ্ঞানের কারণে তাকে উম্মতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এবং কোরআনের ব্যাখ্যাকার উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ৬৮ হিজরীতে তায়েফে ইন্তেকাল করেন তিনি।
হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত
মদীনায় হিজরতের সময় জায়েদের বয়স ছিল মাত্র এগারো বছর। ছোট হওয়ায় বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও খন্দকের যুদ্ধে তিনি মাটি কেটে পরিখা নির্মাণে অংশ নেন। তার অসাধারণ মেধার কারণে নবীজি তাকে ইহুদীদের ষড়যন্ত্র বুঝতে সুরিয়ানি ভাষা শেখার নির্দেশ দেন, যা তিনি অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে আয়ত্ত করেন। এরপর থেকে তিনি নবীজির হয়ে চিঠি লিখতেন এবং ওহী সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব পালন করেন।
নবীজির ওফাতের পর প্রথম খলীফা আবু বকর সিদ্দীক তাকে পবিত্র কোরআন একীভূত করে গ্রন্থাকারে সাজানোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব দেন। ৪৫ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
হজরত আনাস ইবনে মালিক
হিজরতের দশ বছর আগে মদিনায় জন্ম নিয়েছিলেন হজরত আনাস। মদীনায় নবীজির আগমনের পর থেকেই তিনি তার খেদমতে নিযুক্ত হন। দীর্ঘ দশ বছর নবীজির ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে আনাস বলেন, নবীজি কখনো আমাকে মারেননি, গালমন্দ করেননি, এমনকি কোনো বিষয়ে কখনো ভ্রু কুঁচকেও তাকাননি। নবীজির নির্দেশে তিনি সমস্ত গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। প্রায় দুই হাজার হাদীস বর্ণনা করে তিনি ইসলামের অন্যতম প্রধান রাবী হিসেবে স্বীকৃতি পান। ৯১ হিজরীতে ইন্তেকালের মাধ্যমে তাকে সমসাময়িক শেষ বিদায়ী সাহাবী হিসেবে গণ্য করা হয়।
হজরত হাসান ইবনে আলী
হিজরী তৃতীয় বর্ষের রমজান মাসে নবীজির কন্যা ফাতেমা ও আলী দম্পতির ঘরে জন্ম নেন হাসান। নবীজি হাসান ও হোসেনকে পিঠে চড়িয়ে খেলতেন। একবার খুতবা দেওয়ার সময় হাসান ও হোসাইন হেঁটে আসার সময় পড়ে যাচ্ছিলেন দেখে নবীজি মিম্বর থেকে নেমে তাদের কোলে তুলে নেন।
পরবর্তীতে আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর মানুষ হাসানকে খলীফা হিসেবে নির্বাচন করলেও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে তিনি মুআবিয়ার পক্ষে খেলাফত ত্যাগ করেন। নবীজির সেই ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রমাণিত হয় যে, আমার এই সন্তান একজন নেতা, যার উসিলায় আল্লাহ মুসলমানদের দুটি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন। ৫০ হিজরীতে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
হজরত হুসাইন ইবনে আলী
হিজরী চতুর্থ বর্ষের শাবান মাসে জন্ম নেন হুসাইন। ভাই হাসানের মতো তিনিও ছিলেন নবীজির নয়নের মণি। নামাজের সেজদার সময় হুসাইন নবীজির পিঠে চড়লে নবীজি সেজদা দীর্ঘ করতেন। যৌবনে বীরত্বের সাথে হুসাইন হজরত উসমানের খিলাফতকালে উত্তর আফ্রিকা এবং পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধে অংশ নেন। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তার আপসহীন সংগ্রাম ইসলামের ইতিহাসে এক চিরন্তন অধ্যায় হয়ে আছে।