মাথায় বাদামের ট্রে, কাঁধে সংসারের বোঝা ছোট্ট হামিমের!

Little Hamim has the burden of the world on his shoulders!
অনলাইন ডেস্ক ২০ জুন ২০২৬ ০৮:৪৬ অপরাহ্ন সারা বাংলা
অনলাইন ডেস্ক ২০ জুন ২০২৬ ০৮:৪৬ অপরাহ্ন
মাথায় বাদামের ট্রে, কাঁধে সংসারের বোঝা ছোট্ট হামিমের!
--সংগৃহীত ছবি

রাত তখন প্রায় ৮টা। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে কমছে।

ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের কোলাহল আর ব্যস্ততার মাঝেও এক ছোট্ট কণ্ঠ বারবার ভেসে আসে- ‘এই বাদাম দেবো, বাদাম!’

ডাকটি যার, তার নাম হামিম। বয়স মাত্র পাঁচ বছর।

যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই-খাতা, স্কুলব্যাগ কিংবা খেলনা, সেই বয়সে হামিমের মাথায় বাদামের ট্রে, কাঁধে সংসারের দায়িত্ব।

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চরযশোরদী ইউনিয়নের নিকোরহাঁটি গ্রামের সন্তান হামিম।

বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে ভাঙ্গা উপজেলার আলগী এলাকায়, ভূমি অফিসের পাশের একটি ভাড়া বাসায় থাকে। জীবনের বাস্তবতা তাকে খুব অল্প বয়সেই বড় করে দিয়েছে।

হামিমের বাবা সুমন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। পরিবারের উপার্জনের প্রধান মানুষটি যখন অসহায় হয়ে ঘরে পড়ে আছেন, তখন সংসারের হাল ধরতে হয়েছে ছোট্ট হামিমকে। তাই প্রতিদিন বাদাম আর বুট ভাজার ট্রে মাথায় নিয়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন রেলস্টেশন ও ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়ায় সে। যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে সামান্য কিছু টাকা আয় করে। সেই টাকাই কখনও পরিবারের খাবার, কখনও বাবার ওষুধ, আবার কখনও সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোর একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হামিমকে দেখলে মনে হয়, শিশুটি যেন ক্লান্তি শব্দটাই চেনে না। মাথার ওপর বড় ট্রে, মুখে অবিরাম ডাক, আর চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কিন্তু সেই দৃঢ় চোখের আড়ালেই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক শৈশবের গল্প।

হামিম জানে না খেলাধুলার আনন্দ কী, জানে না স্কুলের বেঞ্চে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সুখ। সে জানে কেবল বিক্রি করতে হয়, আয় করতে হয়, কারণ বাড়িতে অপেক্ষা করছেন অসুস্থ বাবা আর অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করা পরিবার।

সমাজের অসংখ্য মানুষের ভিড়ে হামিম হয়তো একটি নামমাত্র। কিন্তু তার গল্প আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে- একটি শিশুর কাঁধে কেন সংসারের বোঝা উঠবে? কেন তার হাতে বইয়ের বদলে থাকবে বাদামের ট্রে?

হামিমের মতো হাজারো শিশুর জীবন আমাদের চারপাশে নীরবে সংগ্রামের গল্প লিখে যাচ্ছে। তাদের প্রয়োজন সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সুযোগ। প্রয়োজন শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।

হয়তো কোনো একদিন হামিমও স্কুলের ইউনিফর্ম পরে বই হাতে হাঁটবে। প্ল্যাটফর্মে আর শোনা যাবে না তার বাদাম বিক্রির ডাক। সেই দিনের অপেক্ষাতেই যেন দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট শিশুটির স্বপ্নভরা দুটি চোখ।

কেউ যদি একটু খোঁজ নেয়, একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে হয়তো বদলে যেতে পারে হামিমের জীবন। হয়তো তার ছোট্ট হাতে আবারও ফিরে আসবে খাতা-কলম, রঙিন বই আর শৈশবের স্বপ্ন। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা এবং পরিবারের আর্থিক সহায়তা পেলে তাকে আর ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বাদাম বিক্রি করতে হবে না।

একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়, সমাজেরও। হামিমের মতো শিশুদের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরি। কারণ আজকের এই শিশুদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের স্বপ্ন বাঁচলে বাঁচবে দেশের স্বপ্নও।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বাদাম বিক্রি করা হামিমের চোখেও আছে সুন্দর জীবনের আশা। সেই আশার আলো নিভে যাওয়ার আগেই প্রয়োজন সবার সম্মিলিত উদ্যোগ। যাতে একদিন হামিম গর্ব করে বলতে পারে-‘আমি শুধু বাদাম বিক্রেতা নই, আমি আমার স্বপ্ন জয় করেছি।’