কলম থেমেছে, রয়ে গেছে সৃষ্টি : স্মৃতি, শ্রদ্ধা আর বেদনায় তসিকুল ইসলাম রাজাকে স্মরণ
মঞ্চজুড়ে প্রয়াত শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কবির স্মৃতি। মিলনায়তনে তাঁর সহকর্মী, অনুরাগী এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের বিষণ্ণ উপস্থিতি। স্মৃতিচারণে উঠে আসছিল তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের নানা অধ্যায়। শ্রদ্ধা, শোক ও হারানোর বেদনায় শনিবার (২০ জুন) বিকেলে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার মিলনায়তনে স্মরণ করা হল বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক, কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ড. তসিকুল ইসলাম রাজাকে। রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার আয়োজিত ওই শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এবং গ্রন্থাগারের সহ-সভাপতি টুকটুক তালুকদার। শোক সভায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অশ্রুসিক্ত নয়নে পিতার প্রতি স্মৃতি চারণ করে বক্তব্য রাখেন- একমাত্র পুত্র সাফিন ইসলাম। স্মৃতিচারণ করেন বক্তব্য রাখেন- রাজশাহী চেম্বার কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলী, প্রফেসর ড. দীপনেন্দ্রনাথ দাস, নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, নিউ গভঃ ডিগ্ৰী কলেজের অধ্যক্ষ ড শিখা সরকার, সোনালী সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক লিয়াকত আলী, সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক আকবারুল হাসান মিল্লাত, বিশিষ্ট সাংবাদিক আহমদ সফি উদ্দিন, কথা সাহিত্যিক ড. নাজিব ওয়াদুদ, রাজশাহী শাহমখদুম কলেজের অধ্যক্ষ এসএম রেজাউল ইসলাম, রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. গোলাম মওলা, কবি হাসনাত আমজাদ, প্রফেসর ড. জুবাইদা আয়শা সিদ্দিকা, প্রথম আলো পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মোহাম্মদ আজাদ। এছাড়াও রাজশাহীর কবি, লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরাও প্রয়াত তসিকুল ইসলাম রাজার জীবন, সৃষ্টি এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলেন।
বক্তাদের কথায়, তসিকুল ইসলাম রাজা কেবল শিক্ষক বা গবেষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধিচর্চার এক সাহসী অভিযাত্রী। অন্যায় ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল প্রতিবাদী। আধুনিক বাংলা কবিতা, ফোকলোর, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আজীবন গবেষণা করেছেন তিনি। তাঁর লেখায় যেমন শিকড়ের সন্ধান পাওয়া যায়, তেমনই উঠে এসেছে দেশ, মানুষ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তসিকুল ইসলাম রাজা রাজশাহীর গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা দেশে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। নতুন লেখক ও গবেষকদের উৎসাহ দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় রাখতে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজশাহীর শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে নিজের লেখা, গবেষণা এবং কর্মের মধ্য দিয়েই তিনি আগামী প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকবেন।
১৯৫৩ সালের ১১ জানুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বালিয়াঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তসিকুল ইসলাম রাজা। রাজশাহী কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে রাজশাহীর শাহমখদুম ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা। দীর্ঘ তিন দশকের কর্মজীবন শেষে ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন এবং রাজশাহী লেখক পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। গত ১৮ মে তাঁর মৃত্যু হয়।
উল্লেখ্য, ড. তসিকুল ইসলাম রাজার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টি। তাঁর শতাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাসর ফেলে যুদ্ধে আয়’, ‘নেই রক্ষা নেই’, ‘রবীন্দ্রোত্তর বাংলাকাব্যে গ্রামীণ জীবন’, ‘রবীন্দ্রনাথের লোকায়ত জীবন ও সংস্কৃতি ভাবনা’, ‘বাংলাদেশে ফোকলোর চর্চার ইতিবৃত্ত ও অন্যান্য প্রবন্ধ’, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা’, ‘রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন’, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে ভাষা আন্দোলন’, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস’ এবং ‘রাজশাহী প্রতিভা’। সাহিত্য, শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি কবি বন্দে আলী মিয়া সাহিত্য পদক, কবিকুঞ্জ পদক, ঋত্বিক ঘটক সম্মাননা পদক, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সম্মাননা পদক, বাংলা একাডেমির সা’দত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার এবং রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননা লাভ করেন। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক হিসেবেও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
স্মরণসভার শেষ পর্যন্ত মিলনায়তনে ছিল বিষণ্ণ নীরবতা। উপস্থিত ব্যক্তিদের অনুভবে বারবার ফিরে এসেছে একই উপলব্ধি—তসিকুল ইসলাম রাজা চলে গিয়েছেন, কিন্তু বরেন্দ্রভূমির ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রেখে যাওয়া তাঁর পদচিহ্ন মুছে যাওয়ার নয়।