ঝড়-বৃষ্টিতে পলিথিন মাথায় রাত কাটে দুর্গাচরণ

Durgacharan Roy
অনলাইন ডেস্ক ২৮ জুন ২০২৬ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন সারা বাংলা
অনলাইন ডেস্ক ২৮ জুন ২০২৬ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন
ঝড়-বৃষ্টিতে পলিথিন মাথায় রাত কাটে দুর্গাচরণ
--সংগৃহীত ছবি

‘এক ছেলে সন্তান আছে। সে বিয়ের পরে বউ নিয়ে আলাদা থাকে। কয়েক বছর ধরে আমার খোঁজ খবর নেয়নি। আমি বয়সের ভারে কাজ করতে পারি না। কেউ কিছু দিলে খাই, না দিলে না খেয়েই থাকতে হয়। সরকারের বয়স্ক ভাতাও পাই না।’

অশ্রুসিক্ত নয়নে কথাগুলো বলছিলেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের বড়ভিটা ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা দুর্গাচরণ রায়। তিনি প্রায় ১২ বছর ধরে গ্রামের পাশের আবদারিয়া পাড়া এলাকায় সেচ ক্যানেলের ধারে অনাহারে-অর্ধাহারে একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন। 

জানা যায়, দুর্গাচরণ রায়ের কোনো জমিজমা না থাকায় প্রায় ১২ বছর আগে স্ত্রীসহ আশ্রয় নেন সেচ ক্যানেলের ধারে। অভাব-অনটনের জীবনে দিন মজুরের কাজ করে স্ত্রীসহ জীবনযাপন করতেন। গত ১০ বছর আগে তার স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন ৷ রোগ-শোক ও বার্ধক্যের কারণে নিয়মিত কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এখন খাবারের জন্য অন্যের সহায়তার অপেক্ষা করতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পাননি তিনি। আয়ের কোন উৎস না থাকায় খাবার জোগাড় করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ দিনই তাকে অনাহারে কাটাতে হয়। তার এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খাদ্য বাসস্থানের অভাবে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় সে এখন কোথায় আছে সেটাও ঠিকমতো বলতে পারেন না।

সরেজমিনে দেখা যায়, নড়বড়ে একটি খুঁটির ওপর কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে দুর্গাচরণের একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই জরাজীর্ণ টিনের ঘর। ঘরের অধিকাংশ টিন মরিচা ধরে ক্ষয়ে গেছে, অনেক জায়গায় টিন ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই ছিদ্রযুক্ত টিন ও পলিথিন ভেদ করে পানি ঢুকে ঘরে হাঁটুসমান পানি জমে যায়।

ঘরের চারপাশের বেড়া তৈরি করা হয়েছে পুরোনো ও ভাঙাচোরা টিন, সুপারির পাতা, পলিথিন, প্লাস্টিক ও চটের বস্তা, ছেঁড়া মশারি এবং পুরোনো কাপড় জোড়া লাগিয়ে। ফলে এসব ফাঁক-ফোকর দিয়ে অনায়াসে ঢুকে পড়ে সাপ, ব্যাঙ, পোকামাকড়। ঝড়-বৃষ্টি হলে ঘরটি যেন আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এমন দুর্বিষহ পরিবেশে প্রায়ই নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় বৃদ্ধ দুর্গাচরণকে। শীতকালেও দুর্ভোগ কমে না, কনকনে ঠান্ডা বাতাস ও ঘন কুয়াশা ভেদ করে ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন পরিস্থিতি আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে।

দুর্গাচরণ রায় গণমাধ্যমকে বলেন, আমি খুব নিঃস্ব মানুষ। আমার খুব কষ্ট হয়। বয়সের ভারে অক্ষম হয়ে পড়ায় কর্ম নাই, পেটে ভাত যায় না। প্রতিবেশী যা দেয়, তা খাই। না দিলে অনাহারে থাকি। এক ছেলে আছে তাও আমার কোনো খবর নেয় না। ঘরে থাকাও যায় না। ঝড়-বৃষ্টি এলে কাপড়-চোপড়, পলিথিন মাথায় দিয়ে ঘরের এক কোণে বসি থাকি।

তিনি আরও বলেন, চেয়ারম্যান, মেম্বারও কোনো সরকারি অনুদানও দেয় না। এ দুঃখের কথা কাকে বলি, বয়স হইছে ৬০ বছরের ওপরে, বয়স্কভাতার আবেদন করে অফিসে ঘুরেছি অনেক। কেউ ভাতা দেয়নি। এ যাবৎ কোনো খবরও নাই। যেখানে মুখের খাবার জোটে না, সেখানে ঘর মেরামত করা অর্থ কোথায় পাব।

স্থানীয় বাসিন্দা হরিকৃষ্ণ রায় বলেন, বৃদ্ধের কোনো ঘর-বাড়ি নেই। তিনি ক্যানেলের পাশের জমিতে থাকেন। তিনি যে ঘরে থাকে সেখানে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। সরকারের উচিত বৃদ্ধকে সহায়তা করা। মানবিক দিক বিবেচনা করে সমাজের বিত্তবান মানুষের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।

আরেক বাসিন্দা মলি রাণি গণমাধ্যমকে বলেন, বৃদ্ধ ঠিকমতো খেতে পারে না। আশপাশের লোকজন তাকে কিছু দিলে সে খায়, না হলে খেতে পারে না। সরকার তাকে সহায়তা করলে থাকার জায়গা ও খাওয়ার পাবে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, খোঁজ খবর নিয়ে দ্রুত সরকারি সুবিধার আওতায় আনার চেষ্টা করছি।

কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে বৃদ্ধকে সমাজসেবা অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদসহ সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তার জন্য যেসব সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা সম্ভব, সেগুলো নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।