সহায়তার ৮ কোটি টাকা বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি

Cost of distributing 8 crore taka: 53 crore
আবুল কালাম আজাদ:- ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৯ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
আবুল কালাম আজাদ:- ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৯ অপরাহ্ন
সহায়তার ৮ কোটি টাকা বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি হারানো অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। --সংগৃহীত ছবি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি হারানো অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রস্তাবিত ওই প্রকল্পের আওতায় ৩০০ জন অসহায় মানুষের ভাগ্য বদলের জন্য অনুদান দেওয়া হবে প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে এই অনুদানের টাকা বিতরণে জন্য পরামর্শক ও প্রশাসনিক বিলাসিতার পেছনে খরচ ধরা হয়েছে ৫৩ কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে বাস্তুহারা ও দরিদ্র মানুষের সহায়তার নামে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই সুকৌশলে আমলা ও পরামর্শকদের পকেটে ভরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জিআইজেড) অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ১ বছর ৯ মাস। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ওপর আজ রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের মতো শহরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। এর মাধ্যমে ৩০০ জন ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা এবং দেড় হাজার জনের জীবিকা উন্নত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটের চিত্র বলছে, এই লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের প্রশাসনিক খরচ মেটাতেই বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যাবে।

গরিবের ভাগে মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ, বাকিটা অন্যদের পকেটে: প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, মোট ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বাজেটের এই প্রকল্পে মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যয়ের চেয়ে পরোক্ষ খরচই কয়েকগুণ বেশি। প্রকল্পের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, দরিদ্র মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের নামে বরাদ্দ করা এই বিপুল অর্থের মধ্যে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে অনুদান হিসেবে পৌঁছাবে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। আর এই অনুদানের অর্থ বিতরণের বিপরীতে কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা খরচ, অফিস ভাড়া এবং বিলাসিতায় খরচ হবে বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার।

সহায়তার চেয়ে আমলা-পরামর্শক তোষণই মুখ্য: প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, তিন জেলার মাত্র ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের (২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী) জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু এই ৩০০ মানুষের জন্য অনুদান বিতরণে ‘পরামর্শ’ দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক। তাদের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৬২ কোটি টাকা ৬৩ হাজার টাকা।

অর্থাৎ বাস্তুহারাদের জন্য যেখানে সরাসরি অনুদান দেওয়া হবে মাত্র ৮ কোটি টাকা, সেখানে দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের পেছনেই ব্যয় হবে ২৯ কোটি ৬২ কোটি টাকা ৬৩ হাজার টাকা; যা মূল ব্যয়র ৪৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে বিদেশ ভ্রমণের আবদার: সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর নির্দেশনা এবং বৈদেশিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ‘সাধ’ মেটাতে কোনো কার্পণ্য করা হয়নি। কর্মকর্তাদের বৈদেশিক ভ্রমণ এবং প্রশিক্ষণের নামে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য আরও রাখা হয়েছে ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

জিআইজেডের অর্থায়নে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নেওয়া এই প্রকল্পে ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয়েছে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া অফিস ভবন ভাড়ার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এমনকি আইটি সামগ্রী ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও উচ্চমূল্য ধরা হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে। বাকি টাকা খরচ হবে প্রশিক্ষণ কর্মশালা, প্রশাসনিক ও ইউটিলিটি বিল, বিভিন্ন দাপ্তরিক সরঞ্জাম ক্রয়, পরিবহন ও জ্বালানি এবং অন্যান্য সেবা ও সরবরাহ খাতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প প্রস্তাবনায়ও রয়েছে অস্পষ্টতা। বাছাই প্রক্রিয়া ও বিধি লঙ্ঘন প্রকল্পটিতে যাদের সহায়তা দেওয়া হবে, সেই বাস্তুচ্যুত ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোন পদ্ধতিতে বাছাই করা হবে, তার কোনো স্বচ্ছ রূপরেখা দেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় ‘পিপিএ-২০০৬’ ও ‘পিপিআর-২০০৮’ এর নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করারও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি প্রকল্পের মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ব্যয় কাঠামো নিয়ে পিইসি সভায় নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে যাচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি। প্রকল্পের আওতায় পরামর্শক, বিদেশ ভ্রমণ ও অফিস ভাড়াসহ নানা খাতের বিশাল অঙ্কের খরচের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ না করারও ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হবে।

কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই হলো এই সুবিধাভোগীদের ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করা এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা। অথচ অন্যান্য খাতে বাজেটের সিংহভাগ খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। পিইসি সভায় এই প্রকল্পের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন ইতোমধ্যে এই উচ্চ পরামর্শক ব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক খরচ যাচাই-বাছাই করেছে। যেসব খাতে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে সেগুলো কমাতে বলা হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের দোহাই দিয়ে নেওয়া এই প্রকল্প যদি বাজেটের সিংহভাগই পরামর্শক আর আমলাতান্ত্রিক খরচে ব্যয় হয়, তবে প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। প্রকল্পের এই ব্যয় কাঠামো সংশোধন না করলে এটি কেবল সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে।

তবে, প্রকল্প প্রস্তাবনায় ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা ও অনিয়মের বিষয়ে দায় নিতে নারাজ সমাজসেবা অধিদপ্তর । তাদের দাবি, প্রকল্পের মূল্য উদ্দেশ্য দরিদ্রদের অনুদানের পরিমাণ কম হওয়া বা পরামর্শক ও কর্মকর্তাদের পেছনে বিপুল ব্যয় হওয়া সত্ত্বেও তারা দাতা সংস্থার শর্তের দোহাই দিয়ে এই প্রকল্প প্রস্তাবনাটি অনুমোদন করার পক্ষে কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এই প্রকল্পের মূল চুক্তিটি হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে। এটি মূলত একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, যা দাতা সংস্থার পছন্দ বা শর্ত অনুযায়ী তৈরি করতে হয়েছে।

অনুদানের তুলনায় পরামর্শক ও প্রশাসনিক খাতে বিপুল ব্যয়ের বিষয়ে তিনি জানান, যেহেতু এটি অনুদানের টাকা, তাই অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার দেওয়া শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা তারা নিজেরা তৈরি করেননি, বরং দাতা সংস্থা (জিআইজেড) এটি তৈরি করে তাদের কাছে পাঠিয়েছে।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাবের বিষয়ে সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি কেবল প্রস্তাবনায় দেওয়া হয়েছে। যদি সরকার অনুমতি দেয় তবেই ভ্রমণ হবে, অন্যথায় এই খাতের টাকা খরচ না হয়ে পড়ে থাকবে। এ ছাড়া অফিস ভাড়ার বিষয়টি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজের প্রয়োজনে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।