মুনাফার নতুন রেকর্ড করতে যাচ্ছে স্যামসাং

Samsung
অনলাইন ডেস্ক ০৬ জুলাই ২০২৬ ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন অর্থনীতি
অনলাইন ডেস্ক ০৬ জুলাই ২০২৬ ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন
মুনাফার নতুন রেকর্ড করতে যাচ্ছে স্যামসাং
--সংগৃহীত ছবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের কারণে বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর জেরে চিপের দাম বাড়ায় চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ গুণ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার দিক থেকে নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে।

বিশ্বের বৃহত্তম মেমোরি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি আগামী মঙ্গলবার এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের আর্থিক খতিয়ান প্রকাশ করতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের পরিচালন মুনাফা হতে পারে ৮৬ লাখ কোটি উওন (প্রায় ৫৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার)। ৩০ জন বিশ্লেষকের মতামতের ভিত্তিতে এলএসইজি স্মার্টএস্টিমেট এই তথ্য জানিয়েছে।

আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৪ লাখ ৭০ হাজার কোটি উওন। সেই তুলনায় এবার মুনাফা ব্যাপক হারে বাড়ছে। এর মাধ্যমে টানা তিন প্রান্তিকে রেকর্ড পরিচালন মুনাফা করতে যাচ্ছে স্যামসাং। মূলত বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অবকাঠামো তৈরিতে চিপের যে বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, বৈশ্বিক নির্মাতারা সেই অনুপাতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছেন না। মেমোরি চিপের এই দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতিই স্যামসাংয়ের মুনাফা বাড়ার মূল কারণ।

বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, মেমোরি চিপের এই তীব্র সরবরাহ ঘাটতি অন্তত আগামী বছর পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্যামসাংয়ের এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পেছনে শুধু হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (এইচবিএম) একাই ভূমিকা রাখেনি; বরং প্রথাগত ড্র্যাম (DRAM) এবং ন্যান্ড (NAND) পণ্যের চাঙ্গা চাহিদাও বড় অবদান রেখেছে। বিশেষ করে, এআই প্রযুক্তি এবং এর আধুনিক সংস্করণ এজেন্টিক এআই কম্পিউটিংয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় এই পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, আগের এআই প্রযুক্তির মূল কাজ ছিল বড় বড় মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। তবে এজেন্টিক এআই ব্যবস্থাগুলো আরও জটিল এবং বহুমুখী কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে পারে। ফলে সার্ভার প্রসেসরের জন্য বাড়তি মেমোরির প্রয়োজন হয়। একই সাথে ডেটা বিশ্লেষণ ও তা পুনরুদ্ধারের (ইনফারেন্স) সময় তথ্য জমা রাখার জন্য আরও বেশি স্টোরেজ বা ধারণক্ষমতার দরকার পড়ে।

বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া, গুগল এবং অ্যাপলের মতো জায়ান্টদের মেমোরি চিপ সরবরাহের অন্যতম প্রধান অংশীদার স্যামসাং।

গত বৃহস্পতিবার সিটি রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় ড্র্যাম (DRAM) এবং ন্যান্ড (NAND) চিপের গড় বিক্রয়মূল্য যথাক্রমে ৪৪ শতাংশ ও ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।

মেমোরি চিপের এই চলমান ঘাটতি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সুবাতাস এনে দিয়েছে। চলতি বছরেই স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ারের দাম ১৫৮ শতাংশ, এসকে হাইনিক্সের ২৭৩ শতাংশ এবং মাইক্রোনের শেয়ারের দাম ২৪২ শতাংশ বেড়েছে। শেয়ারের এই আকাশচুম্বী দামের ওপর ভর করে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানেরই বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

চিপ কর্মীদের বোনাস বদলে দিতে পারে মুনাফার হিসাব

ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বেশ চাঙ্গা থাকা সত্ত্বেও বাজার বিশ্লেষকেরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্যামসাং যদি কর্মীদের বোনাসের জন্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ (প্রভিশন) রাখে, তবে চূড়ান্ত মুনাফা প্রাক্কলিত হিসাবের চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে।

গত মে মাসের শেষের দিকে বড় ধরনের ধর্মঘট এড়াতে স্যামসাং কর্তৃপক্ষ কর্মীদের সাথে একটি মজুরি চুক্তি করে। ওই চুক্তি অনুযায়ী, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ বিভাগের পরিচালন মুনাফার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ চিপ কর্মীদের বিশেষ বোনাস হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে এই খরচের হিসাব কোন প্রান্তিকে দেখানো হচ্ছে, তার ওপরই মূলত দ্বিতীয় প্রান্তিকের চূড়ান্ত মুনাফা নির্ভর করছে।

চলতি মাসের শেষের দিকে স্যামসাং তাদের এই প্রান্তিকের বিস্তারিত আর্থিক প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে।

ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে চিপের বাজার

ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মেমোরি চিপের এই চাঙ্গা বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে এআই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে সম্ভাব্য ধীরগতি।

সম্প্রতি জেপি মরগানের এক নোটে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের সিংহভাগই বর্তমান বাজারে মেমোরি চিপের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতার (ঘাটতি) বিষয়ে একমত। তবে ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট মূলধনি ব্যয়ের (ক্যাপেক্স) সিংহভাগই যেভাবে এআই মেমোরি চিপের পেছনে চলে যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে—তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। চলতি বছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ মোট মূলধনি ব্যয়ের ৫২ শতাংশ হতে পারে এবং আগামী বছর তা ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এআই খাতে বিনিয়োগের সামান্যতম পতনও স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্সের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। গত সপ্তাহেও এই দুই প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ কোরিয়ায় চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ৩ হাজার ২০০ লাখ কোটি উওন (প্রায় ২ দশমিক ০৭ ট্রিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্যামসাং ২০২৬ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে এই বিশাল বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করলেও, এসকে হাইনিক্স তাদের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো প্রকাশ করেনি।

জেপি মরগান জানিয়েছে, এআই সেবার বৈপ্লবিক অগ্রগতি ক্লাউড কম্পিউটিং এবং এআই-সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর রাজস্ব বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে কি না—বিনিয়োগকারীরা এখন তার আরও স্পষ্ট প্রমাণ খুঁজছেন। এই প্রমাণ পাওয়া গেলেই কেবল এআই অবকাঠামো ব্যয়ের বড় একটি অংশ মেমোরি চিপের পেছনে ঢালার যৌক্তিকতা মিলবে।

বিশ্বের শীর্ষ এই মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি গত এপ্রিলে জানায়, বাজারে নিজেদের সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা বেশ কিছু ক্রেতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই করেছে। তবে ব্যবসায়িক সুরক্ষার স্বার্থে চুক্তির শর্ত বা ক্রেতাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে জাপানি আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নোমুরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সাধারণ ড্র্যাম (DRAM) চিপের দাম আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২৪ শতাংশ এবং ন্যান্ড (NAND) চিপের দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। মূলত সাধারণ গ্রাহকপর্যায়ের মেমোরি পণ্য এবং প্রথাগত ও এআই ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত চিপের জোরালো চাহিদার কারণেই দাম এভাবে বাড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছে নোমুরা।

এদিকে, চিপের চাঙ্গা বাজার স্যামসাংয়ের সেমিকন্ডাক্টর বিভাগের জন্য সুসংবাদ আনলেও, উল্টো চাপে ফেলেছে এর মোবাইল ফোন ব্যবসাকে। মেমোরি চিপের দাম বাড়ায় স্মার্টফোন তৈরির উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বেড়ে গেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির এই বিভাগের মুনাফার মার্জিন বা হার কমিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি হ্যান্ডসেটের দাম বাড়ানো হলেও যন্ত্রাংশের অতিরিক্ত খরচের ধাক্কা তা দিয়ে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

যদিও স্যামসাং ইতিমধ্যেই তাদের কিছু স্মার্টফোনের দাম বাড়িয়েছে, তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বছরের দ্বিতীয় ভাগে (জুলাই-ডিসেম্বর) হ্যান্ডসেটের দাম আরও বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে। এর আগে গত মাসেই স্যামসাংয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপল তাদের আইপ্যাড এবং ম্যাকবুকের দাম বাড়িয়েছে। 

সূত্র : রয়টার্স