মেসির নতুন জুতায় লুকিয়ে আছে ২০ বছরের বিশ্বকাপের ইতিহাস
বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসিকে দেখলেই দর্শকদের চোখ সবার আগে চলে যায় তার পায়ের দিকে। কারণ তিনি শুধু ফুটবল খেলেন না, প্রতিটি ম্যাচে যেন নিজের ক্যারিয়ারের নতুন একটি অধ্যায় লিখে চলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই আবেগকে আরও বিশেষ করে তুলেছে অ্যাডিডাসের তৈরি এক্সক্লুসিভ বুট এল উলতিমো তাঙ্গো, যার অর্থ ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’ বা অনেকের ভাষায় ‘শেষ নাচ’।
ফুটবলপ্রেমীদের ধারণা, সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা মেসির দীর্ঘ বিশ্বকাপ যাত্রাকে সম্মান জানাতেই এই বিশেষ বুট তৈরি করা হয়েছে।
আর্জেন্টিনার রঙে আঁকা এক বিশেষ স্মারক
অ্যাডিডাসের এফ ৫০ মেসি এলিট সিরিজের এই বুটটি প্রথম দেখাতেই নজর কাড়ে। আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশি, সাদা ও রুপালি রঙের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এর নকশা। বুটের গায়ে খোদাই করা রয়েছে তিনটি বিশ্বকাপজয়ী তারকা, মেসির ব্যক্তিগত লোগো এবং তার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতীক। পুরো ডিজাইনজুড়েই ফুটে উঠেছে আর্জেন্টিনা এবং মেসির ফুটবল পরিচয়ের ছাপ।
২০ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাস একজোড়া জুতায়
এই বুটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর সূক্ষ্ম নকশায়। অ্যাডিডাস জানিয়েছে, মেসির ২০০৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপে ব্যবহৃত বুটের রং, টেক্সচার ও ডিজাইনের অনুপ্রেরণা একত্র করা হয়েছে এই বিশেষ সংস্করণে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ২০২৬ সালের এই বুটের মূল নকশা অনুপ্রাণিত হয়েছে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে মেসির প্রথম বিশ্বকাপ অভিষেকের সময় পরা সাদা-আকাশি বুট থেকে। সেই শুরুর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০১০ সালের কালো বুট, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের ডিজাইন, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের সংস্করণ এবং ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সময় পরা সোনালি বুটের অনুপ্রেরণা।
মেসির পাঁচটি বিশ্বকাপে ব্যবহৃত প্রতিটি বুটের রঙের ক্ষুদ্র অংশ, সূক্ষ্ম টেক্সচার কিংবা সেলাইয়ের নকশা নতুন এই বুটের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি যেন তার পুরো বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের একটি জীবন্ত কোলাজ।
শুধু বুট নয়, এক জীবন্ত টাইমলাইন
ফুটবল বুট সাধারণত পারফরম্যান্সের জন্য তৈরি হয়। কিন্তু বুট এল উলতিমো তাঙ্গো সেই ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি শুধু একটি স্পোর্টস গিয়ার নয়, বরং মেসির ২০ বছরের বিশ্বকাপ যাত্রার স্মারক। তার স্বপ্ন, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, ফাইনালে হার, আবার ফিরে এসে বিশ্বকাপ জয়ের গল্প- সবকিছুর প্রতীক হয়ে উঠেছে এই একজোড়া জুতায়।
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া
শুধু নান্দনিকতাই নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এটি অত্যন্ত উন্নত। এফ ৫০ মেসি এলিট মডেলে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত হালকা ওজনের উপাদান এবং হাইব্রিটটাচ প্লাস প্রযুক্তি, যা দ্রুত গতি, বলের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ এবং আরামদায়ক অনুভূতি নিশ্চিত করে।
মেসির খেলার ধরন মাথায় রেখেই বুটটির ফিটিং, গ্রিপ এবং স্টাডের বিন্যাস তৈরি করা হয়েছে। ফলে দ্রুত দিক পরিবর্তন, ছোট জায়গায় ড্রিবলিং এবং বল নিয়ন্ত্রণে এটি বাড়তি সুবিধা দেয়। পুরো বুটটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে মাঠে তার স্বাভাবিক খেলার ছন্দে কোনো বাধা না আসে।
কেন এত আলোচনায়
বিশ্বকাপে প্রায় সব তারকাই নতুন বুট পরে মাঠে নামেন। কিন্তু মেসির এল উলতিমো তাঙ্গো অন্যদের থেকে আলাদা। কারণ এটি কেবল নতুন ডিজাইনের একটি জুতা নয়; বরং তার পুরো ফুটবল জীবনের প্রতীক।
২০০৬ সালে তরুণ প্রতিভা হিসেবে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু, এরপর ২০১৪ সালের হৃদয়ভাঙা ফাইনাল, ২০১৮ সালের হতাশা, ২০২২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং ২০২৬ সালে সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণে এই দীর্ঘ পথচলার প্রতিটি স্মৃতি যেন বন্দি হয়েছে এই একজোড়া জুতায়।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তাই এটি শুধু একটি দামি ফুটবল বুট নয়, বরং একজন কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের স্মারক। বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসি যখন এই বুট পরে মাঠে নামেন, তখন তার সঙ্গে থাকে শুধু একটি জুতা নয়- থাকে দুই দশকের স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাফল্য এবং ইতিহাস গড়ার অগণিত স্মৃতি।
সূত্র: ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডি, ফাস্ট কোম্পানি ও অন্যান্য