নকশিকাঁথার সেলাইয়ে স্বপ্ন বোনা, শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতনে ফল প্রকাশ ও বৃক্ষরোপণ উৎসব
নকশিকাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ে যেন লেখা হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যতের গল্প। সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে পরিচালিত রাজশাহীর পবা উপজেলার ভুগরইল খ্রিষ্টানপাড়ার শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতনে অনুষ্ঠিত হয়েছে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। শিক্ষার্থীদের আনন্দ, আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ওরাং নৃত্য এবং অতিথিদের অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনটি রূপ নেয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
শনিবার (১ আগস্ট) সকাল ১০টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই আদিবাসী শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী ওরাং নৃত্যের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানানো হয়। নৃত্য পরিবেশনায় ফুটে ওঠে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক।
পরে শিক্ষার্থীদের হাতে পরীক্ষার ফলাফল তুলে দেন এমপি মিলন। কৃতী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেন তিনি। পরিবেশের প্রতি শিশুদের দায়িত্ববোধ তৈরি করতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে গাছের চারা তুলে দিয়ে সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যার দায়িত্বও দেওয়া হয়।
অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় চতুর্থ শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থী সূর্য বিশ্বাস পেয়েছে একটি পেয়ারা গাছের চারা। আনন্দ প্রকাশ করে সে বলে, “পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আমি অনেক খুশি। এমপি স্যার আমাকে যে পেয়ারা গাছটি দিয়েছেন, সেটি বাড়িতে লাগিয়ে যত্ন নেব। গাছটি বড় হলে ফল খাব এবং অন্যদেরও গাছ লাগাতে উৎসাহ দেব।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন বলেন, “বৃক্ষরোপণ কেবল একটি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব। পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশি করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যাও নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা জরুরি। তাহলেই আমরা একটি সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে পারব।”
তিনি আরও বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যানের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা তারেক রহমানের ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এরই অংশ হিসেবে শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতনে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতনের উদ্যোগের প্রশংসা করে এমপি মিলন বলেন, “এই বিদ্যানিকেতন শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি শিক্ষা, স্বাবলম্বিতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি সুন্দর উদাহরণ। নকশিকাঁথা তৈরির মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সুমী মুর্মুর এই প্রচেষ্টা দেখিয়েছে, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আন্তরিকতা ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার চেয়ারম্যান এবং শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সুমী মুর্মু।
নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভুগরইল গির্জার ফাদার পল পিটার কস্তা, পবা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক, কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির রাজশাহী বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়াদুদ হাসান পিন্টু, জেলা যুবদলের সদস্য ইফতেখারুল ইসলাম ডনি এবং গ্রাম্য প্রধান জুলিয়ান বিশ্বাস।
সভাপতির বক্তব্যে সুমী মুর্মু বলেন, “একটি শিক্ষিত শিশুই পারে একটি পরিবার ও সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিতে। এই লক্ষ্যেই মায়েদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। নকশিকাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ের সঙ্গে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন জড়িয়ে আছে। আমরা চাই, পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুরা মানবিকতা, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বও শিখুক। সবার সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।”
শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতন সূত্রে জানা যায়, এটি একটি স্বনির্ভর শিক্ষা উদ্যোগ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সাঁওতাল নারীরা নকশিকাঁথা তৈরি করে যে অর্থ উপার্জন করেন, তার একটি অংশ ব্যয় করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায়। ফলে একদিকে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সেই আয়ের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষার পথও সুগম হচ্ছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে আদিবাসী শিশুদের পাশাপাশি বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের শিশুরাও একসঙ্গে লেখাপড়া করছে। শিক্ষা, নারী স্বাবলম্বিতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও পরিবেশ সচেতনতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি স্থানীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।