রাবিতে যুদ্ধাপরাধীদের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড ঘিরে বিতর্ক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্যারিস রোডে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারের সংগঠন ‘নভো কালচার’-এর উদ্যোগে টাঙানো একটি বিলবোর্ডকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে বিতর্ক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত কয়েকজন নেতার ছবি ব্যবহার করে তৈরি ওই বিলবোর্ড অপসারণ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীরা।
শনিবার (১লাআগস্ট)‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামে বিলবোর্ডটি টাঙানো হয়। এতে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি প্রদর্শন করা হয়। একই সঙ্গে শাপলা চত্বরের অভিযান, জুলাই আন্দোলন, লগি-বৈঠা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, কোটা আন্দোলন ও আয়নাঘরসহ বিভিন্ন বিষয়ও এতে তুলে ধরা হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিলবোর্ডটি অপসারণের দাবি জানান কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মুখপাত্র ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “রাকসু হোক বা নভো কালচার- যেই এ ধরনের উদ্যোগ নিক না কেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিংবা বাংলাদেশের কোথাও রাজাকারদের কোনো ধরনের স্বাভাবিকীকরণ আমরা মেনে নেব না।”
তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নটি বাংলাদেশের মৌলিক জাতীয় ইস্যু। ২০২৪ সালের আন্দোলন কিংবা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধী মতাদর্শ বা তাদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই। ২০২৪-কে আশ্রয় করে জামায়াত-শিবির তাদের রাজনীতি ও আদর্শকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, আমরা তার বিরোধিতা করছি।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, “দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে অতীতের অপ্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ইস্যু জুড়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। যুদ্ধাপরাধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য নয়।”
ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, “১৯৭১ সালের আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর চিহ্নিত সদস্যদের আমরা ঘৃণাভরে স্মরণ করি। ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো উপস্থাপন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “নভো কালচারের প্রতিষ্ঠাতা রাকসুর সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।”
অভিযোগের বিষয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও নভো কালচারের পরিচালক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “বিলবোর্ডের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জুডিশিয়াল কিলিং’। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, আয়নাঘর, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটেই এটি তৈরি করা হয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, “উদ্দেশ্য কাউকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়; বরং তাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল কি না, সেই বিতর্কটি সামনে আনা। বিচার চলাকালে সাক্ষী সুকরঞ্জন বালীর নিখোঁজ হওয়া এবং স্কাইপ কথোপকথন ফাঁসের মতো ঘটনাগুলোও জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। সে কারণেই ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ প্রসঙ্গটি বিলবোর্ডে স্থান পেয়েছে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নই। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।