রাজশাহীতে রেল কর্মকর্তার উপর হামলা ॥ মামলা দায়ের-পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে পশ্চিম রেলের একজন চিফ কর্মকর্তা সহ বেশ কয়েকজন রেল কর্মচারীর উপর সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলা, মারধরের প্রতিবাদ ও দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রেলওয়ে পশ্চিমের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার(১০ আগস্ট) রেল কর্মচারীরা সকাল সাড়ে ১০টায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে ও সাড়ে ১১ টায় রেলওয়ে পশ্চিম রাজশাহী রেল ভবনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয় ।
মানববন্ধনে রেল কর্মচারীরা বলেন, রেলওয়ে স্টেশন একটি সংরক্ষিত এলাকা। এখনে এসে তারা প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসানুল্লাহ ভূঁইয়াার উপর অতর্কিত হামলা করে, হামলা ঠেকাতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এএসআই ফজলুর রহমান, এ এস আই আনোয়ার হোসেনসহ রেলকর্মীরা এগিয়ে আসলে তাদের উপরও সন্ত্রাসিরা চড়াও হয়। তাদের এলোপাতাড়ি আঘাতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এএসআই ফজলুর রহমান গুরুতর জখম সহ কয়েকজন রেল কর্মী আহত হয় ।
তারা বলেন গত ৭ আগস্ট সন্ধ্যায় আব্দুরপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে রাজশাহী গামী আন্তঃনগর সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছাড়ার পর পশ্চিম রেলের চিপ কমার্শিয়াল ম্যানেজার আহসানউল্লা ভূঁইয়া ট্রেনের রানিং স্টাফদের নিয়ে ট্রেনটি চেকিং করার সময় এসি কোচে পাঁচজন যাত্রীকে দাঁড়ানো অবস্থায় পায়। তাদের নিকট টিকিটদেখতে চাইলে তারা বলেন,তাড়াহুড়া করে ট্রেনে উঠেছেন টিকিট কাটতে পারে নাই। তখন কর্তব্যরত টিটিই ও গার্ড রাজশাহী পর্যন্ত তাদের জরিমানা সহ টিকিট করে দেন। এবং তাদের এসি বগি থেকে শোভন ক্লাস বগিতে যেতে বলেন।
টিকিট বানিয়ে দেয়া এবং শোভন চেয়ার বগিতে যেতে বলায় তাদের আত্মসম্মানে লাগে। সে সময় তারা সিসিএমকে রাজশাহীতে দেখে নিব বলে হুমকি দেন।
ট্রেনটি রাত্রি সাড়ে ৯টায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন পৌঁছার পর সিসিএম ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন ভবন থেকে বের হয়ে কার পারকিংয়ে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের কারে তোলার সময় ট্রেনের ভিতরের ওই যাত্রীদের আত্মীয়-স্বজনেরা প্রায় ১৫/২০ জন অস্ত্রশস্ত্রসহ সিসিএমের উপর অতর্কিতভাবে হামলা করে। হামলা ঠেকাতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দুইজন এএসআই সহ ৭/৮ জন রেলকর্মী আহত হয়।
রেল কর্মচারীদের দাবি, সরকারি দায়িত্ব পালনে বারবার তাদের সন্ত্রাসীদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে।এই সন্ত্রাসী হামলার সাথে যারা জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
অন্যদিকে ৭ আগস্ট আব্দুলপুরে ট্রেনের ভিতরের ঘটনা তুলে ধরে ৯ আগস্ট তারা পশ্চিম রেল ভবনে মানববন্ধন করে। মানববন্ধনে মোছাম্মৎ জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, তারা তাড়াহুড়া করে আব্দুর পুর রেল স্টেশন আন্তঃনগর সিল্কসিটি ট্রেনটিতে উঠেে করিডোরে দাঁড়ীয়ে ছিলেন।তাদের সাথে তার অসুস্থ। শাশুড়িও ছিলেন। এসময় সিসিএম দলবল নিয়ে এসেই তাদর সাথে কর্কশ স্বরে তুই তোকারে আচরন করেন।আমরা তাকে মার্জিত ভাষায় কথা বলতে বললে তিনি আরো ক্ষিপ্ত হন এবং আমাদের ৪০০ টাকার টিকিট করে দেন। এরপর আমাদের ঐ বগি থেকে নেমে যেতে বলেন। তাকে আমার অসুস্থ বৃদ্ধ শাশুড়ির কথা বলতেই তিনি আমার বৃদ্ধা শাশুড়ীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন এবং বগি থেকে নামিয়ে দেন। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এহেন আচরণে তারা মর্মাহত।
মোছাম্মৎ জান্নাতুল ফেরদৌসী মানববন্ধে সিসিএম এর দুর্ব্যবহার, ধাক্কা দিয় ফেলে দেয়ার জন্য তাকে রাজশাহী থেকে অপসারণ ও তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
‘আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল:-
বৃদ্ধা যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আহসানউল্লাহ ভূঁইয়া।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ভালো নেই। আমাকে ওরা মেরে ফেলতে চেয়েছিল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। ঘটনার পর থেকে আমি মানসিক ট্রমায় ভুগছি।’
৭ আগস্টের ট্রেনের ভিতরের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, সেদিন রানিং স্টাফদের নিয়ে সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে টিকিট চেকিং করছিলেন তিনি। এ সময় এসি বগিতে ৫জন যাত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা টিটিই তাদের টিকিট দেখতে চাইলে তারা মহানন্দা ট্রেনের টিকিট দেখান।
‘একসঙ্গে তাদের দুটি অনিয়ম ছিল। চারটি টিকিটে পাঁচজন ভ্রমণ এবং মহানন্দা মেইল ট্রেনের টিকিট নিয়ে সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে উঠা।মানবিক কারনে রেলের নিয়ম অনুযায়ী তাদের নিকট থেকে জরিমানাসহ আব্দুলপুর- রাজশাহী ভাড়া আদায় করা হয় এবং তাদের শোভন চেয়ার কোচে যেতে বলা হয়।এতে তাদের বোধ হয় আত্মসম্মানে বাঁধে। এ সময় তারা এক মহিলা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে ও আমার স্টাফদের গালিগালাজ এবং পরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।’
আহসানউল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, ঘটনার রাত( ৭ আগস্ট)সোয়া ৯ টায় ট্রেনটি রাজশাহী রেলস্টেশন আসার পর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে কার পার্কিংয়ে পরিবার নিয়ে গাড়ীতে উঠার সময় সময়, ১৫/২০ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অতর্কিতভাবে তার ওপর হামলা চালায়।
তিনি বলেন, ‘কিছু বোঝার আগেই তারা আমাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। এ সময় প্রবেশগেটে কর্তব্যরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয়।’
তার দাবি,তাকে বাঁচাতে আসা নিরাপত্তা বাহিনীর ২জন "এএসআই"সহ আরও কয়েকজন রেলকর্মী আহত হয়েছেন। এসময় জীবনের তোয়াক্কা না করে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে মানবঢাল তৈরি করে বুকিং অফিসে নিয়ে যান।
আহসানউল্লাহ বলেন, ‘তারা আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। আমাকে মেরে ফেলতে না পারার ক্ষোভেই তারা আমার অপসারণের দাবি ও বানানো অভিযোগে মানববন্ধন করেছ।
তিনি বলেন, ‘আমি রেলের একজন কর্মচারী। রেলের আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছি। তারা আমাকে মেরে ফেলার জন্য হামলা করে আহত করেছে—এটা কি তাদের অন্যায় নয়? আমি তো মাস্তান নই যে, মারধর করে প্রতিশোধ নেব। আমি আমার নিরাপত্তার জন্য থানায় অভিযোগ করেছি। আইনই এর সমাধান করবে।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বলেন, ৭ আগস্ট সিল্কসিটি এক্সপ্রেসের ঘটনাটি তিনি জানেন। তার ভাষ্য, ‘আমার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রেলের আইন অনুযায়ী কাজ করেছেন। তারপরও আমি বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে বসার কথা বলেছিলাম। ৮ আগস্ট সরকারি ছুটি থাকায় ৯ আগস্ট অফিস সময়ে বসার কথা ছিল।’তবে এর আগেই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে রেলের সংরক্ষিত এলাকায় চড়াও হয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে আহত করা হয়েছে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে ২জন নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাসহ ৬/-৭জন আহত হয়েছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও গুরুতর অপরাধ।’
রেলের বিধির ব্যাখ্যা দিয়ে জিএম বলেন, ‘রেলওয়ে চলে তার নিজস্ব আইনের গতিতে। রেলের আইন অনুযায়ী চলন্ত ট্রেনে টিকিটবিহীন যাত্রীকে ট্রেনটির প্রারম্ভিক স্টেশনের যাত্রী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাকে প্রারম্ভিক স্টেশন থেকেই জরিমানাসহ ভাড়া দিতে হবে। যাত্রী ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতের মাধ্যমে ভাড়া আদায় করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শোভন চেয়ার শ্রেণির যাত্রীর এসি কোচে বসা বা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করা রেল আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ক্ষেত্রে কর্তব্যরত টিটি, টিটিই বা গার্ড তাকে শোভন চেয়ার কোচে যেতে বাধ্য করতে পারেন অথবা ওই কোচ থেকে নামিয়ে দিতে পারেন।’
জিএম ফরিদ আহমেদের দাবি, ওই যাত্রীরা কয়েকটি অনিয়ম করেছেন। এগুলো হলো—লোকাল ট্রেনের টিকিট নিয়ে আন্তঃনগর ট্রেনে ভ্রমণ, চারটি টিকিটে পাঁচজনের ভ্রমণ, এসি কোচে ভ্রমণ এবং একজন ঊর্ধ্বতন রেল কর্মকর্তার ওপর চড়াও হয়ে মারধর করা।
তিনি বলেন, ‘কর্তব্য পালনে যদি সরকারি কর্মচারীদের কথায় কথায় লাঞ্ছিত হতে হয়, তাহলে কর্মচারীদের কাজে অনীহা দেখা দেবে। একই সঙ্গে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা হারাবে।’
রাজশাহী রেলওয়ে জিআরপি থানার অফিসার ইনচার্জ ফয়সাল বিন আহসান জানান,এই ঘটনায় রাজশাহী রেলওয়ে জিআরপি থানায় একজন নমীয় সহ ১০/১৫ জন অজ্ঞাতের নামে জিআরপি থানায় মামালা হয়েছে।মামলা নং ১,তারিখ ০৮/০৮/২০২৬।
তিনি আরো জানান,পশ্চিম রেলের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসান আলী ভূঁইয়া নিজেই বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন।
মামলার এজারনমীয় আসামী সহ অজ্ঞাত আসামীদের ফুটেজ দেখে শনাক্তকরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য প্রমাণসহ আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
তবে বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগমকে ধাক্কা দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং তাদের কাছ থেকে ৪০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে পরিবারের বক্তব্যের বিপরীতে রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য থাকলেও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তদন্তের ফল এখনো পাওয়া যায়নি।
ফলে বৃদ্ধাকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ, ট্রেনে যাত্রীদের টিকিট ও কোচসংক্রান্ত অনিয়ম এবং পরদিন স্টেশনে সিসিএমের ওপর হামলার অভিযোগ—তিনটি ঘটনাই তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার দরকার বলে মনে কোরছেন রাজশাহীর সুশীল সমাজের মানুষজন।