মাদক উদ্ধারে জেলা ডিবি পুলিশের নাটক, স্থান ও সংখ্যা পরিবর্তন করে থানায় মামলা
রাজশাহী জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ১হাজার বোতল নিষিদ্ধ ‘এসকাফ’ (ESkuf) উদ্ধার কোরলেও তা দেখানো হয়েছে ৪শত বোতল।এছাড়া অর্থের বিনিময়ে আসামীকে ছেড়ে দেয়া ও ঘটনার স্থান পরিবর্তন দেখানোরও অভিযো উঠেছে রাজশাহী জেলা পুলিশের উপর।
পুলিশের মাদক বিরোধী অভিযানকে ঘিরে ঘুষের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়া, ৬০০ বোতল মাদক গায়েব, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি উদ্ধারকে নাটক বানানো এবং মূল ঘটনাস্থল পরিবর্তনের মতো চাঞ্চল্যকর নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের মূলে ডিবির সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মাহবুব জড়িত বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের।
পুলিশের পাঠানো বিজ্ঞপ্তির বক্তব্য:
রাজশাহী জেলা পুলিশের মিডিয়া উইং সূত্রে জানানো হয়, গত ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ রাত ১০:৪৫ ঘটিকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেলা ডিবির এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ আশাফুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল গোদাগাড়ী থানাধীন জৈটাবটতলা এলাকায় অভিযান চালায়। জনৈক মোঃ মাসুদ রানার বসতবাড়ির পশ্চিমে পাকা রাস্তার ওপর সীলভার-গোল্ডেন রঙের একটি প্রাইভেটকার নিয়ে দুই মাদক কারবারি অবস্থান করছিল। ডিবির উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা গাড়ি হাঁকিয়ে নাচোল অভিমুখে পালিয়ে যায়।
পুলিশের দাবি, আসামিদের ফেলে যাওয়া দুটি প্লাস্টিকের বস্তা তল্লাশি করে ৪০০ বোতল এসকাফ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার সোনা মসজিদ গ্রামের মোঃ রুবেল হক (২৬) এবং কমলাকান্তি রাণীহাটি গ্রামের মোঃ কামিরুল (২৫)-কে পলাতক দেখিয়ে গোদাগাড়ী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে।
অভিযানের বাস্তব চিত্র:
পুলিশের দেওয়া এই তথ্যের সাথে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল নেই বলে অভিযোগ স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রত্যক্ষদর্শী ও সচেতন মহল জানান,আসল ঘটনাস্থল চাঁপাই নবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে।মূল ঘটনাটি গোদাগাড়ীর জৈটাবটতলায় ঘটেনি।
জানাগেছ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মাদক কারবারীদের গাড়িটি দুর্ঘটনাকবলিত ও ভাঙচুর অবস্থায় পড়ে ছিল। মূলত সেখান থেকেই অভিযান পরিচালনা করা হয়, যা পরবর্তীতে গোদাগাড়ীতে দেখানো হয়েছে।
৬০০ বোতল এসকাফ গায়েব: -
গোমস্তাপুরে গাড়ি থেকে মোট ১,০০০ বোতল এসকাফ উদ্ধার করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে মাত্র ৪০০ বোতল মামলায় দেখানো হয়েছে এবং বাকি ৬০০ বোতল চড়া দামে বিক্রি করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা।
ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মূল আসামিকে:-
দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি থেকে মাদক কারবারিদের আহত অবস্থায় ধরা হলেও ১ জন আসামিকে নগদ ৪ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর পুরো ঘটনাটি গোদাগাড়ীর জৈটাবটতলায় সাজানো নাটক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
নেপথ্যে এএসআই মাহবুব:-
পুরো ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জেলা ডিবির এএসআই মাহবুবের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এই ঘুষ বাণিজ্য ও মাদক গায়েবের নেপথ্যে মূল কারিগর তিনিই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে এএসআই মাহবুবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ছুটিতে আছি। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।” তবে তাঁর এই বক্তব্যকে অস্বীকার করে স্থানীয়দের দাবি, অভিযানের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ও সম্পৃক্ত ছিলেন।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য:
বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “গোদাগাড়ীর জৈটাবটতলা এলাকা থেকে ৪০০ বোতল এসকাফ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী মাদক মামলা রুজু করা হয়েছে।” তবে ঘুষ গ্রহণ, আসামি ছেড়ে দেওয়া বা গোমস্তাপুরের ঘটনা সংক্রান্ত অন্য সকল অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
মামলার বাদি এসআই আসাফুল, তাদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,তারা পরিত্যাক্ত অবস্থায় মালিক বিহীন ৪০০ বোতল নিষিদ্ধ এসকপ সিরাপ উদ্ধার করে গোদাগাড়ী থানায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে জমা দিয়েছেন।এখানে কিছুই মিসিং হয়নি। তিনি আরো বলেন, ভালো কাজের সমালোচনায় পুলিশ মাদক বিরোধী অভিযানসহ অপরাধ দমনে নিরুৎসাহি হচ্ছে। তিনি সাংবাদিকদের সত্যটা লেখার আহ্বান জানান।
একজন দায়িত্বশীল এএসআইয়ের প্রত্যক্ষ মদদে বিশাল পরিমাণের মাদক গায়েব ও ঘুষের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় এলাকা জুড়ে চরম অসন্তোষ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সুশীল সমাজ ঘটনাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে।