লোডশেডিংয়ে বাড়ছে আলু পচন, হিমাগার বাড়তি খরচ॥ বিপাকে কৃষক

Potato rot is increasing due to load shedding
রাজশাহী প্রতিনিধি: ২২ আগস্ট ২০২৬ ০৮:৩৩ অপরাহ্ন নির্বাচিত সংবাদ
রাজশাহী প্রতিনিধি: ২২ আগস্ট ২০২৬ ০৮:৩৩ অপরাহ্ন
লোডশেডিংয়ে বাড়ছে আলু পচন, হিমাগার বাড়তি খরচ॥ বিপাকে কৃষক
ঘন ঘন লোডশেডিং, তার ওপর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু—দুইয়ের চাপে রাজশাহীর হিমাগারগুলোতে বাড়ছে আলু পচনের ঝুঁকি।

ঘন ঘন লোডশেডিং, তার ওপর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু—দুইয়ের চাপে রাজশাহীর হিমাগারগুলোতে বাড়ছে আলু পচনের ঝুঁকি। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর আলু সংরক্ষণের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে হিমাগার মালিকদের। এতে প্রতি ঘণ্টায় গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা জ্বালানি খরচ। কোথাও কোথাও প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।


রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ এলাকার তামান্না স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজের চিত্র পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। সেখান থেকে প্রতিদিন গাড়ি ভর্তি করে পচা আলু বের করে ফেলে দিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতির সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় পচন বাড়ছে।


কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৩৯টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি বর্তমানে সচল। এসব হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে উৎপাদন বেশি হওয়ায় অনেক হিমাগারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে রাজনৈতিক নেতাদের চাপেও কিছু হিমাগারকে অতিরিক্ত আলু নিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।


তামান্না স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজে আলু রেখেছেন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু লোড নেওয়া হয়েছিল। এখন লোডশেডিংয়ের কারণে আলু ঘেমে পচে যাচ্ছে। পচে যাওয়া আলু ফেলে দিতে হচ্ছে।’

তবে আলু পচনের জন্য শুধু লোডশেডিংকে দায়ী করতে নারাজ রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী। তাঁর দাবি, হিমাগার মালিকদের অব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত আলু নষ্ট হচ্ছে।


তিনি বলেন, ‘লোডশেডিংয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে মালিকদের অব্যবস্থাপনার কারণে আলু পচে যাচ্ছে। তাঁরা মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত আলু লোড নিয়েছেন। এ কারণেই আলু নষ্ট হচ্ছে।’


সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনিও অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণকে পচনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একটি হিমাগারে বছরে ২৫ থেকে ৩০ বার আলুর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। প্রয়োজনে আলু বের করে বাতাস দেওয়ারও প্রয়োজন হয়। কিন্তু ধারণক্ষমতার বেশি আলু রাখায় অনেক হিমাগারে এবার সেই ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করা হচ্ছে না।


ডনি বলেন, ‘ওভারলোডিংয়ের কারণে আলু পচে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এবার চাষি ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কতটা হবে, তা ধারণার বাইরে।’


উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রাজশাহীর আলাইবিদিরপুরের রহমান ব্রাদার্স-১ কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন। অথচ সেখানে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, রাজশাহীর প্রায় সব হিমাগারেই কোনো না কোনোভাবে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু নেওয়া হয়েছে।


অবশ্য হিমাগার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে চাপের কারণে কিছু হিমাগারকে অতিরিক্ত আলু নিতে হয়েছিল। তবে বর্তমানে ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না এবং এ কারণে আলুও নষ্ট হচ্ছে না।


লোডশেডিংয়ের কারণে অবশ্য হিমাগার মালিকদের বাড়তি খরচের কথা স্বীকার করেছেন তিনি। ফজলুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরও এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত হিমাগারের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। তবে এর বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। এক ঘণ্টা জেনারেটর চালাতেই অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা জ্বালানি খরচ হয়। বর্তমানে প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।


তিনি বলেন, ‘এমনিতেই বিদ্যুৎ বিল বেশি। হিমাগারগুলোকে মাসে ২৫ থেকে ২৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল দিতে হয়। এর সঙ্গে জেনারেটরের খরচ যোগ হলে আমাদের আরও সমস্যা হয়। আমরা চাই, হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক।’


অন্যদিকে, রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, গত বুধবার থেকে লোডশেডিং কমে গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি ভালো। হিমাগারগুলোতে সমস্যা হচ্ছে—এমন অভিযোগ জানিয়ে কেউ তাঁকে ফোন করেননি বলেও দাবি করেন তিনি।


তিনি বলেন, কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও হিমাগারগুলোতে সাধারণত বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।


তবে হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর পরিমাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতি—সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে আলু নষ্টের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতির অবনতি হলে এর প্রভাব আলুর বাজার ও কৃষকের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।