নিরাপত্তার নামে রুয়েটের ফিমেল হলে সিসিটিভি, প্রাইভেসি নিয়ে ছাত্রীদের ক্ষোভ
নিরাপত্তার কথা বলে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ফিমেল হলের করিডর, সিঁড়ি ও ওয়াশরুমে যাওয়ার পথে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ছাত্রীদের মধ্যে।
তাঁদের অভিযোগ, সংবেদনশীল এসব স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করা হলে তা তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির গুরুতর লঙ্ঘন ঘটাবে। একই সঙ্গে ফুটেজের নিরাপত্তা ও অপব্যবহারের আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।
ছাত্রীদের দাবি, হলের ভেতরে তাঁরা স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পোশাকে চলাফেরা করেন। অথচ করিডর, সিঁড়ি কিংবা ওয়াশরুমে যাওয়ার পথ এমন জায়গা, যেখানে তাঁদের নিয়মিত চলাচল করতে হয়। ফলে এসব স্থানে সার্বক্ষণিক ভিডিও ধারণের ব্যবস্থা করা হলে নিজেদের আবাসিক পরিবেশেও তাঁরা নিরাপত্তাহীন ও অস্বস্তিতে পড়বেন।
ছাত্রীদের ভাষ্য, হলের রুমে রান্নার সুযোগ না থাকা, ডাইনিং-সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা পানি সংকটের কারণে অনেক সময় তাঁদের রুম থেকে বের হয়ে করিডর দিয়ে ওয়াশরুম, অন্য ফ্লোর বা হলের বাইরের অংশে যেতে হয়। এ অবস্থায় এসব চলাচলের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা তাঁদের ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপের শামিল।
‘চুরি ঠেকাতে ক্যামেরা:-
‘চুরি ঠেকাতে ক্যামেরা’—যুক্তি মানতে নারাজ ছাত্রীরা হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই বছর আগে করিডর থেকে চুরির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে ছাত্রীদের দাবি, এ যুক্তিতে শত শত আবাসিক ছাত্রীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।
তাঁদের ভাষ্য, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী সাধারণত ছাত্রীরা নিজেদের কক্ষেই রাখেন। করিডরে পড়ে থাকে মূলত জুতা, পাপোশ বা এ ধরনের তুলনামূলক কম মূল্যের জিনিস। সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য পুরো আবাসিক এলাকার চলাচল নজরদারির আওতায় আনা কতটা যৌক্তিক—তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
ছাত্রীদের আশঙ্কা:-
সিসিটিভির ফুটেজ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নিরাপত্তা না থাকলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত ভিডিও বা ছবি ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলের গোপন ভিডিও বা ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাগুলোও তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে ক্যামেরা নষ্ট হলে বা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তা মেরামতের জন্য পুরুষ টেকনিশিয়ানদের ফুটেজে প্রবেশাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁদের দাবি:-
ছাত্রীদের আবাসিক এলাকায় নজরদারি ব্যবস্থা চালু করার আগে ফুটেজ কারা দেখতে পারবেন, কতদিন সংরক্ষণ করা হবে, কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
সিসিটিভির পাশাপাশি হল ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ
শুধু ক্যামেরা স্থাপন নয়, ফিমেল হলের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রীরা।
তাঁদের অভিযোগ:-
হল-১-এর খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে। খাবারে পোকামাকড় পাওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি মাছ-মাংসের টুকরো ছোট এবং খাবারের মান ও স্বাদ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যেই হঠাৎ নোটিশ দিয়ে হল-২ থেকে কুপন কাটার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় সমস্যা আরও বেড়েছে বলে দাবি তাঁদের।
হল-১-এর কয়েকজন ছাত্রীর অভিযোগ, কোনো সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের কাছে গেলে অনেক সময় তাঁদের সঙ্গে শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণের পরিবর্তে ‘প্রতিপক্ষের মতো’ আচরণ করা হয়। ফলে সমস্যার সমাধান চেয়েও তাঁরা অনেক সময় স্বস্তি পান না।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক সময়েও হলের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করেছেন ছাত্রীরা। তাঁদের দাবি, ২০ সিরিজের থিসিস ডিফেন্সের সময় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ ও ওয়াই-ফাই না থাকা এবং ২১ সিরিজের সেমিস্টার ফাইনালের দিন সকালে হঠাৎ ওয়াশরুম বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনায় তাঁরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বহিরাগত প্রবেশ ঠেকানোসহ মৌলিক সমস্যার সমাধান চান ছাত্রীরা:-
ছাত্রীদের অভিযোগ, নতুন হলে ওঠার পর থেকেই বহিরাগতদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, লিফট নষ্ট থাকা, পানির ট্যাপ নষ্ট হওয়া এবং অন্যান্য মৌলিক সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না করে নতুন করে নজরদারিমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তাঁদের প্রশ্ন, ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে প্রথমে কেন বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নষ্ট লিফট, পানির সমস্যা, খাবারের মান ও অন্যান্য মৌলিক সেবার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না?
ছাত্রীদের মতে, নিরাপত্তা ও প্রাইভেসি—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার নামে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যাতে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
‘করিডর-সিঁড়িতে সিসিটিভি নয়’:-
ছাত্রীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ফিমেল হলের কক্ষের বাইরে করিডর, ফ্লোর, সিঁড়ি কিংবা ওয়াশরুমে যাওয়ার পথে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন তাঁরা মেনে নেবেন না।
তাঁদের দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে—যেমন প্রবেশপথে নিয়ন্ত্রিত অ্যাক্সেস, বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তাকর্মী বৃদ্ধি কিংবা সংবেদনশীল স্থান বাদ দিয়ে কেবল প্রবেশ ও বহির্গমন পয়েন্টে ক্যামেরা স্থাপন।
ছাত্রীদের চূড়ান্ত দাবি, ফিমেল হলের সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে সিসিটিভি স্থাপনের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি হলের বিদ্যমান মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে যেকোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।