তফসিলের আগেই রাসিকে ভোটের হাওয়া ॥ জামায়াতের একক, বিএনপি'র একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচন কবে হবে, এখনো তার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনও ঘোষণা করেনি তফসিল। কিন্তু এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় নগরজুড়ে শুরু হয়েছে নির্বাচনী আলোচনা। রাজনৈতিক দলের নেতারা ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারও। ফলে তফসিল ঘোষণার আগেই রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে বইতে শুরু করেছে সিটি নির্বাচনের হাওয়া।
ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী মেয়র পদে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে বলে জানা গেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও মেয়র পদে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। তবে এনসিপির প্রার্থীর বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানা যায়নি।
অন্যদিকে বিএনপিতে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা অর্ধডজনের বেশি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রায় সবাই বলছেন, শেষ পর্যন্ত দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তাঁর পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।
জামায়াতের প্রার্থী জাহাঙ্গীর:-
রাসিক নির্বাচনে মেয়র পদে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে প্রার্থী করেছে জামায়াতে ইসলামী। এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর কাছে ২৮ হাজার ১৭৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি।
তবে এবার সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে ভিন্ন কৌশলে মাঠে নামতে চায় জামায়াত। দলটির প্রার্থী জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমঝোতার বাইরে গিয়ে নির্বাচন করায় তাঁদের কিছু ভুল-ত্রুটি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার আরও সংগঠিতভাবে ভোটের মাঠে কাজ করতে চান তাঁরা।
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাঙ্গীরকে ঘিরে প্রচার শুরু হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর দলীয়ভাবে প্রচার-প্রচারণা আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশী অর্ধডজনের বেশি:-
রাসিক মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মেয়র ও দলের কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বর্তমান রাসিক প্রশাসক ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন, নগর বিএনপির সহসভাপতি ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শহীন শওকত, নগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন, জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক শফিকুল আলম সমাপ্ত এবং নগর যুবদলের সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম রবি।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অভিজ্ঞতা। ২০০৮ সালের সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের কাছে পরাজিত হলেও ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনে আবারও লিটনের কাছে পরাজিত হন তিনি।
এ কারণে বিএনপির একটি অংশ তাঁকে এবারও শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে দেখছে। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর তাঁকে রাসিক প্রশাসকের দায়িত্ব না দিয়ে বাংলাদেশ বন ও শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।
দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত’:-
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কথা বলছেন না।
মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপিতে পাঁচ থেকে সাতজন সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই তাঁর সিদ্ধান্ত। দলের প্রয়োজনে তিনি সবসময় প্রস্তুত রয়েছেন।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট বলেন, রাজশাহী সদর আসন সবসময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দল তাঁকে মনোনয়ন দিলে তিনি বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হলে তার প্রভাব নির্বাচনে পড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শহীন শওকত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজপথে সক্রিয়। অনেকেই তাঁকে সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন। তবে দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তাঁর পক্ষেই সবাই একসঙ্গে কাজ করবেন।
ভোটের মাঠে হিসাব-নিকাশ শুরু:-
তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিএনপিতে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় দলটির প্রার্থী বাছাইকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা এবং এনসিপির প্রার্থী চূড়ান্ত করার খবরে নির্বাচনের সম্ভাব্য সমীকরণ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোন দল কাকে প্রার্থী করে, কোন দলের সঙ্গে কার রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয় এবং ভোটের মাঠে কতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন—এসবের ওপরই নির্ভর করবে রাজশাহী সিটি নির্বাচনের চূড়ান্ত চিত্র।
তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের বর্তমান তৎপরতা মূলত রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও জনসংযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার হবে রাজশাহী সিটির মেয়র পদে কারা লড়ছেন এবং নগরবাসীর ভোটের লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়।