সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাঃ থেমেছে হাতুড়ির শব্দ, থামেনি কারিগরি ঐতিহ্য

"The sound of the hammer has stopped, but the technical tradition has not."
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০১ পূর্বাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০১ পূর্বাহ্ন
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাঃ থেমেছে হাতুড়ির শব্দ, থামেনি কারিগরি ঐতিহ্য
ছবি - বিজয় বাংলা

একসময় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার শপগুলোতে দিন-রাত চলত লোহা কাটার শব্দ, হাতুড়ির আঘাত আর বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও রেল কোচ মেরামতের কর্মযজ্ঞ।

আগুনের ফুলকি আর লোহা কাটার ঝাঁঝালো শব্দ আর কারিগরদের কলকাকলিতপ একসময় দিন-রাত মুখরিত থাকত সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা।

১৮৭০ সালে ছোট একটি মিটারগেজ বাষ্পীয় লোকোমোটিভ মেরামত শেড হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই কারখানা ১৯৫৩ সালে পূর্ণাঙ্গ ওয়ার্কশপে রূপ নেয় এবং ১৯৬৬ সালে চালু হয় ক্যারেজ নির্মাণ শপ। সময়ের সঙ্গে রেলের প্রযুক্তি বদল হওয়ায় ১৯৮৫ সালে বাষ্পীয় লোকোমোটিভ ও ১৯৯৩ সালে ক্যারেজ নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে কারিগরি দক্ষতার সেই উত্তরাধিকার হারিয়ে যায়নি; অভিজ্ঞ শ্রমিক-কর্মীদের হাত ধরে তা ছড়িয়ে পড়েছে সৈয়দপুর শহরের আনাচকানাচে।

আজ পাঁচ শতাধিক ছোট-বড় কারখানা নিয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পবলয়ই সৈয়দপুরকে দিয়েছে ‘দ্বিতীয় জিনজিরা’র পরিচিতি। অথচ এই শিল্পযাত্রার মূল শিকড় যে রেলওয়ে কারখানা, সেটিই এখন তীব্র জনবল সংকট ও কাঁচামালের ঘাটতিতে ধুঁকছে।


জনবল ও কাঁচামাল সংকটে স্থবির উৎপাদন:-

বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচেয়ে বড় এই ওয়ার্কশপটি বর্তমানে চরম জনবল সংকটে ভুগছে। প্রায় ২ হাজার ৮৫৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৭১০ জন কর্মী। ফলে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হলেও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল, কাঁচামাল সরবরাহ ও বাজেট-সংকটের কারণে এর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

কোচ মেরামতেই হিমশিম অবস্থা:-

জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে কারখানায় মেরামত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরুতে কারখানায় প্রায় ২০০টি কোচ পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে শতাধিক কোচ শুধু চাকা পরিবর্তনের অভাবে এবং বাকিগুলো ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ঘাটতিতে চালু করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সচল কোচের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি এবং সামগ্রিক যাত্রীসেবার ওপর।

কারখানা থেকে শহরে ছড়ানো কারিগরি দক্ষতা:-

রেলওয়ের কাজ করতে করতে স্থানীয় কারিগররা ধীরে ধীরে নিজস্ব ছোট ওয়ার্কশপ গড়ে তোলেন। বর্তমানে সৈয়দপুরে পাঁচ শতাধিক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় দুই হাজার ধরনের যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব কারখানার বার্ষিক উৎপাদন মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে শতাধিক কারখানা সরাসরি রেলের যন্ত্রাংশ তৈরি করে।

নমুনা দেখেই যন্ত্র তৈরির মুন্সিয়ানা:-

কোনো আধুনিক নকশা বা ডিজিটাল প্রযুক্তি ছাড়াই কেবল পুরোনো যন্ত্রাংশ সামনে রেখে হুবহু নতুন যন্ত্র বানাতে সিদ্ধহস্ত এখানকার কারিগররা। পুরোনো লোহা, স্টিলের শিট কিংবা জাহাজভাঙা শিল্পের স্ক্র্যাপ ব্যবহার করে তারা রেলের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্পকারখানার বিভিন্ন মেশিন তৈরি করে দেন।

রেলের যন্ত্রাংশেই ৫০ কোটি টাকার বাজার:-

সৈয়দপুরের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে রেলওয়ে অন্যতম প্রধান বাজার। স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের রেলের যন্ত্রাংশ এখানে উৎপাদিত হয়। বিসিক নীলফামারী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান দরপত্রের মাধ্যমে সরাসরি রেলওয়েতে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে।

আমদানিনির্ভরতা কমানোর বড় সম্ভাবনা:-

কারখানার পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পের এই বিকাশ আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পথ খুলে দিয়েছে। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক নকশা, সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।


উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা:-

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার আধুনিকায়নে ‘Modernization and Capacity Enhancement of Saidpur Railway Workshop with Assembling Facilities’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের ওপর ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রেল কারখানার পাশাপাশি স্থানীয় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতও নতুন গতি পাবে।

১৮৭০ সালের একটি ছোট শেড থেকে জন্ম নেওয়া কারিগরি মেধা আজ পুরো শহরের অর্থনীতি বদলে দিয়েছে। রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় জনবল, কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটায়, তবে সৈয়দপুরের এই কারিগরি শক্তি দেশের শিল্পখাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।