১০ বছরের পুরোনো ভাড়ার তালিকায় ঝুলছে বিষপুর ফেরীঘাট ॥ টোল পুনর্নির্ধারণের আবেদনেও সাড়া মিলেনি রাসিক কতৃপক্ষের
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সেবামূল্যের দাম কয়েক গুণ বাড়লেও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) আওতাধীন বিষ্ণুপুর ফেরীঘাটে এখনো বহাল রয়েছে বাংলা ১৪২৩ বঙ্গাব্দের (প্রায় ১০ বছর আগের) টোল ও মাশুল আদায়ের তালিকা।
বর্তমান ১৪ ৩৩ বঙ্গাব্দে এসে বাজারদরের সাথে তৎকালীন ভাড়ার বিশাল তফাত তৈরি হওয়ায় চরম আর্থিক লোকসান ও বিপাকে পড়েছেন ঘাটের ইজারাদার। বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে টোল বৃদ্ধির জন্য বারবার সিটি কর্পোরেশনের কাছে লিখিত আবেদন জানানো হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী মহানগরীর রাজারহাতাস্থ নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ঘাটের ইজারাদার মো. মোসাদ্দাত হোসেন (তুহিন)।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ইজারাদার মোসাদ্দাত বলেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষ্ণুপুর ফেরীঘাটের ১৪ ৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে তিনি ১৮,০৫,৫৫৫ (আঠারো লাখ পাঁচ হাজার পাঁচশত পঞ্চান্ন) টাকা দাখিল করে ইজারা পান। পাশাপাশি তাঁকে আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদও বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ইজারা নেওয়ার পর তিনি জানতে পারেন টোল আদায়ের জন্য সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্ধারিত যাত্রী পারাপার ভাড়ার মুল্য তালিকাটি মূলত বাংলা ১৪২৩ বঙ্গাব্দের।
গত এক দশকে বাজারে জ্বালানি তেল, শ্রমিকের মজুরি এবং সার্বিক পরিচালন ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও ঘাটে ১০ বছর আগের হারের তালিকা অনুযায়ী টোল আদায় করতে হচ্ছে।
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে টোল পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে ইজারাদার মোসাদ্দাত হোসেন বলেন, বর্তমান পরিচালন খরচের সাথে মিলিয়ে সাধারণ ভাড়া কমপক্ষে দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। তার দাবি পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে যাত্রী পারাপার ২ টাকার পরিবর্তে ৫ টাকা, মালামালসহ যাত্রী পারাপার মনপ্রতি ১০ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা, গরু ও মহিষপ্রতি ৪০০ টাকা, ছাগল ও ভেড়া ৬০ টাকা, আরোহীসহ রিকশা ও মোটরসাইকেল ৩০ টাকা এবং মাছের ঝোলা ৩০ টাকাসহ অন্যান্য সব রেট বর্তমান বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণের জোর দাবি জানান।
তিনি তার লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বাংলা ১৪ ৩৩) তারিখে ইজারাদার রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের administrator/প্রশাসক বরাবর ‘টোল বৃদ্ধি করণ সংক্রান্ত’ একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ১৮ লাখ টাকারও বেশি দামে ইজারা নেওয়ার পর পুরোনো ভাড়ার তালিকায় টোল আদায় করতে গিয়ে তিনি মারাত্মক অর্থসংকটে পড়েছেন।
অন্যদিকে, গত ১ মে ২০২৬ তারিখে (স্মারক নং- ৪৬.১২.০০০০.০০৩.২৩.০৬০.২৪.৬১২) রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন থেকে চিঠির মাধ্যমে ইজারাদারকে ১৪ ৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য ইজারা মূল্যের ওপর ১০% আয়কর (১,৮০,৩৫৫.৩০ টাকা) এবং ১৫% ভ্যাট (২,৭০,৫৩২.৯৫ টাকা) বাবদ মোট পাওনা টাকা দ্রুত পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর পরিশোধ না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন।
ভুক্তভোগী ইজারাদার আরো বলেন, একদিকে শতভাগ ইজারা মূল্য ও সরকারি রাজস্ব পরিশোধের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ঘাট পরিচালনার মূল উৎস 'টোল তালিকা' যুগোপযোগী করা হচ্ছে না। ১০ বছরের পুরোনো হারে টোল আদায় করে বর্তমানে ঘাট পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, দরপত্র দাখিলের সময় সিটি কর্পোরেশন কৌশলে শিডিউলের (দরপত্র) সাথে দরের তালিকা সংযুক্ত করেনি। এর ফলে তিনি বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী দরপত্র দিয়েছিলেন। তিনি সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে কাজটি পাওয়ার পর দেখেন যাত্রী পারাপারের তালিকাটি ১৪২৩ বঙ্গাব্দের (১০ বছর আগের)। এই তালিকা অনুযায়ী পারাপার ভাড়া নিলে তিনি মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। তাই তিনি সিটি কর্পোরেশনের টোলের তালিকা দ্রুত পুনর্নির্ধারণ করে তা কার্যকরে সিটি কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অন্যদিকে ঘাটটির পারাপার টোল সংক্রান্ত বিষয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সচিব সোহেল রানা বলেন, "ফেরিঘাটটির টেন্ডারের সময় টোল আদায়ের হারের তালিকা দেখে ও জেনেশুনেই ইজারাদার ঘাটটির ডাক দিয়েছিলেন।" তবে তিনি স্বীকার করে বলেন, "টোল আদায়ের তালিকাটি ১০ বছর আগের। ইজারাদার মো. মোসাদ্দাত হোসেন (তুহিন)-এর টোল বৃদ্ধির আবেদনটি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনার জন্য রাসিকের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"