লোডশেডিংয়ে ১৫ লাখ বস্তা বীজ আলু পচন ঝুঁকিতে
মাঠে উৎপাদিত আলুর ন্যায্য দাম নেই, অন্যদিকে হিমাগারে সংরক্ষণ ব্যয় নিয়েও কৃষক-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মালিকপক্ষের বিরোধ চলছে। এর মধ্যে তীব্র গরমে ঘন ঘন লোডশেডিং নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে রাজশাহীর হিমাগারগুলোতে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় হিমাগারের শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেনারেটর চালানো হলেও তাতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। ফলে জেলার ৪২টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ বস্তা আলু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বীজ আলু নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, হিমাগারগুলোতে প্রায় ১৫ লাখ বস্তা বীজ আলু সংরক্ষিত রয়েছে। এসব আলু তাপমাত্রার তারতম্যে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগামী মৌসুমে বীজের সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।তবে হিমাগারে বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে কৃষক-ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে রয়েছে ভিন্নতা।
হিমাগার কর্তৃপক্ষের একাংশ বলছে, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে এবং জেনারেটর চালিয়ে ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন। অন্যদিকে আলু ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের দাবি, হিমাগারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ পাচ্ছে!অতিরিক্ত ব্যয়ের অজুহাতে আলু নষ্ট হওয়ার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেই মূল ঝুঁকি:-
হিমাগারসংশ্লিষ্টরা জানান, আলু দীর্ঘদিন ভালো রাখতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের গরমে সংরক্ষণ কক্ষ ঠান্ডা রাখতে শীতলীকরণ যন্ত্র দীর্ঘ সময় চালাতে হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। পরে বিদ্যুৎ ফিরে এলেও কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রায় পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমান এগ্রো কোল্ডস্টোরেজের এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় হিমাগারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে কিছু যন্ত্র চালু রাখা হলেও পুরো শীতলীকরণ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় সচল রাখা কঠিন। এতে পরিচালন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি আলুর মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
আসমা হিমাগারের এক কর্মকর্তা বলেন, হিমাগারের মেশিন নির্দিষ্ট সময় ধরে চালাতে হয়। মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ব্যয়বহুল। বিশেষ করে বীজ আলু সংরক্ষণকারীরা এ নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
জেনারেটরে ঘণ্টায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা:-
রহমান হিমাগারের এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করেই হিমাগারের পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। একটি কক্ষ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় আনতে যদি এক ঘণ্টা সময় লাগে, এর মধ্যে ৩০ মিনিট বিদ্যুৎ না থাকলে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং পরে আবার অতিরিক্ত সময় মেশিন চালাতে হয়।
তাঁর দাবি, জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। ফলে লোডশেডিং যত বাড়ছে, হিমাগারের পরিচালন ব্যয়ও তত বাড়ছে।
এর আগে রাজশাহীর বিভিন্ন হিমাগার নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালাতে ঘণ্টায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের তথ্যও উঠে এসেছে।
আসমা ও রহমান হিমাগারের চিত্র:-
আসমা হিমাগারের জিএম আশরাফ আলী বলেন, তাঁদের হিমাগারে এক লাখ ৪৪ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫২ হাজার বস্তা বের হয়ে গেছে। বর্তমানে রয়েছে প্রায় ৯২ হাজার বস্তা।
রহমান হিমাগারের ব্যবস্থাপক আব্দুল হালিম জানান, তাঁদের হিমাগারে মোট দুই লাখ ২৫ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ হাজার বস্তা বের হয়েছে। অর্থাৎ এখনো দেড় লাখের মতো বস্তা আলু সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
বীজ আলু নিয়ে কৃষকের উদ্বেগ:-
পবা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের কৃষক নুর মোহাম্মদ বলেন, বাজারে আলুর দাম এমনিতেই কম। এর মধ্যে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু নষ্ট হলে কৃষকের লোকসান আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, ‘আগামী মৌসুমে বপনের জন্য হিমাগারে বীজ আলু রেখেছি। বিদ্যুতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তায় আছি। বীজ আলু নষ্ট হলে পরের বছর ভালো ফলন পাওয়া কঠিন হবে।’
তাঁর দাবি, বীজ আলুর জন্য হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
আলু বিজ নষ্ট হলে দায় কার:-
আলু ব্যবসায়ী কাম উৎপাদক আব্দুল হাকিম ও শামীম বলেন, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের পর তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হিমাগার কর্তৃপক্ষের। বিদ্যুৎ-সংকটের অজুহাতে সংরক্ষিত আলু নষ্ট হলে এর দায় হিমাগার কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।তাঁদের ভাষ্য, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারে আলু রাখার সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যে চুক্তি বা সমঝোতা করেন, সেখানে আলু বের করে নেওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণের দায়িত্ব হিমাগার কর্তৃপক্ষের ওপরই থাকে।
‘হিমাগারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ পাচ্ছে’:-
তবে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে—এটা ঠিক। তবে হিমাগারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ পাচ্ছে বলেই তাঁদের জানা আছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া অনেক বেশি। ফলে জেনারেটর চালানোর অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে কৃষক-ব্যবসায়ীদের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। বর্তমান বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতে অনেক হিমাগারে জেনারেটর চালানোর প্রয়োজনও হওয়ার কথা নয়।
ডনি বলেন, সরকারের ওপর বিদ্যুৎ-সংকটের দায় চাপিয়ে আলু নষ্ট করার কোনো চেষ্টা হলে কৃষক-ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেবেন না। তবে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক—সব পক্ষের স্বার্থেই হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভাড়া নিয়েও আগে থেকেই বিরোধ:-
বিদ্যুৎ-সংকটের সঙ্গে হিমাগার ভাড়া নিয়ে বিরোধও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত জুনে রাজশাহী জেলা প্রশাসন হিমাগার ভাড়া নিয়ে বিরোধের পর সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে আগের ৬ টাকা ভাড়া বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরা ভাড়া কমিয়ে সর্বোচ্চ ৪ টাকা করার দাবি জানান। তাঁদের অভিযোগ ছিল, উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় বাড়তি সংরক্ষণ ব্যয় তাঁদের লোকসান আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রাজশাহীর কয়েকটি হিমাগারে আলু পচে নষ্ট হওয়ার ঘটনায় চাষি ও হিমাগার মালিকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তথ্যও উঠে এসেছে।
এখনো বড় অংশের আলু হিমাগারে:-
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর ৪২টি হিমাগারে এখনো বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষিত রয়েছে। এর একটি বড় অংশ বাজারজাতের অপেক্ষায় থাকা সাধারণ আলু এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আগামী মৌসুমের জন্য রাখা বীজ আলু।ফলে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির মাত্রা শুধু বর্তমান সংরক্ষিত আলুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশেষ করে বীজ আলুর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগামী মৌসুমে বীজের সরবরাহ, উৎপাদন খরচ ও বাজারদরে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় হিমাগারগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই, সংরক্ষণ কক্ষের তাপমাত্রা নিয়মিত মনিটরিং এবং আলু নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের স্বার্থ বিবেচনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যয়ের বিষয়টি সমন্বয়ের ওপরও জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
হিমাগারের তথ্যচিত্র :-
হিমাগার কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী রাজশাহীতে হিমাগারের সংখ্যা ৪২টি। সংরক্ষিত আলু প্রায় ৬৫–৭০ লাখ বস্তা,বীজ আলু প্রায় ১৫ লাখ বস্তা,জেনারেটর পরিচালন ব্যয় ঘণ্টায় প্রায় ১২,৫০০ টাকা।
* এর মধ্যে,আসমা হিমাগারে সংরক্ষিত ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার বস্তা, বর্তমানে আছে প্রায় ৯২ হাজার বস্তা।
* রহমান হিমাগারে সংরক্ষিত ছিল: ২ লাখ ২৫ হাজার বস্তা,বর্তমানে মজুদ আছে ১ লাখ ৫০হাজার বস্তা।
* আগের নির্ধারিত সংরক্ষণ ভাড়া: কেজিতে ৬ টাকা
বর্তমানে: কেজিতে সর্বোচ্চ ৪ টাকা।