বরাদ্দ থাকালেও বিলম্বে বিল তৈরী, গেইটকিপারদের বেতন বিল নিয়ে রেলওয়েতে অসন্তোষের শঙ্কা
রেলপথের লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্ব পালনকারী গেইটকিপারদের বেতন পরিশোধে দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের ‘লেভেল ক্রসিং গেইটসমূহের পুনর্বাসন ও মান উন্নয়ন’ প্রকল্পে নিয়োজিত গেইটকিপারদের জুলাই ২০২৬ মাসের বেতন বিল নির্ধারিত সময়ে জমা না পড়ায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রকল্পটির বিপরীতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রয়েছে।
অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে, বেতন বিল দ্রুত পাঠাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রকৌশলীদের আগামী দুই কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৯ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম)-এর কার্যালয় থেকে জারি করা এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
রেলওয়ের নথি বলছে, প্রকল্পে নিয়োজিত গেইটকিপারদের মাসিক বেতন বিল প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানোর জন্য আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জুলাই মাসের বেতন বিল নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পৌঁছেনি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে বেতন বিল পাঠানোর জন্য একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। এর ফলে গেইটকিপারদের বেতন বিল পাস ও পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে। এতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিল প্রেরণে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিলম্ব:-
বেতন বিল নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—চলতি অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বিপরীতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রয়েছে বলে চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নথিতে অর্থের সংকটের কথা বলা হয়নি; বরং বিল প্রেরণের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিলম্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।
রেলওয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে সাধারণত মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে বিভাগীয় প্রকৌশলী, প্রকল্প কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম যুক্ত থাকে। বেতন বিল নির্ধারিত সময়ে না পৌঁছালে কর্মীদের পাওনা পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াই পিছিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে জুলাই মাসের বিল নিয়েই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের অসন্তোষের আশঙ্কা:-
লেভেল ক্রসিং গেইটকিপারদের কাজ কেবল একটি সাধারণ শ্রমিকের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গেইটযুক্ত রেলক্রসিংয়ে ট্রেন চলাচলের সময় গেট নিয়ন্ত্রণ, সড়কপথের যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব রয়েছে। ফলে এসব কর্মীর বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ না হলে তার প্রভাব কর্মপরিবেশে পড়ার আশঙ্কা থাকে। আর কর্মীদের অসন্তোষ যদি দায়িত্ব পালনে অনীহা, কর্মবিরতি বা অন্য কোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে গড়ায়, তাহলে তা জননিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
দায় এড়ানোর বার্তা:-
বেতন বিল দ্রুত পাঠানোর নির্দেশের পাশাপাশি চিঠিতে কঠোর বার্তাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের অসহযোগিতা ও অবহেলার কারণে শ্রমিক অসন্তোষ থেকে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার দায়ভার প্রকল্প পরিচালক বহন করবেন না।
চিঠিটি বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং গেইটসমূহের পুনর্বাসন ও মান উন্নয়ন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী/পি অ্যান্ড ডি (পশ্চিম) বীরবল মন্ডল স্বাক্ষর করেছেন।
এতে বিভাগীয় প্রকৌশলী/১ ও ২, পাকশী এবং বিভাগীয় প্রকৌশলী, লালমনিরহাটকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি অবগতির জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পশ্চিম) এবং প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম)-কেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।
লেভেল ক্রসিং নিরাপত্তায় গেইটকিপারদের ভূমিকা:-
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্কে বিভিন্ন স্থানে রেললাইন সড়কের সঙ্গে সমতলে মিলিত হয়েছে। এসব লেভেল ক্রসিংয়ের একটি অংশে গেট পরিচালনা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন গেইটকিপাররা।
বিশেষ করে ব্যস্ত সড়ক ও রেলপথের সংযোগস্থলে একজন দায়িত্বশীল গেইটকিপারের উপস্থিতি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে তাঁদের কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ।
এ অবস্থায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ থাকার পরও কেন জুলাইয়ের বেতন বিল নির্ধারিত সময়ে জমা পড়ল না—এ প্রশ্নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন বিলম্ব ঠেকাতে প্রশাসনিক নজরদারি কতটা কার্যকর হয় সেটি এখন দেখার বিষয়।
এখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দুই কর্মদিবসের মধ্যে জুলাইয়ের বেতন বিল পাঠানোর নির্দেশ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে এবং গেইটকিপারদের বেতন কবে পরিশোধ করা হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।