কারুশ্রী জুয়েলার্সের চুরির উদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন ॥ ২৬ ভরি স্বর্ণ ও ২৫ লাখ টাকা উদ্ধারসহ গ্রেফতার ৮

8 arrested with recovery of 26 kg of gold and 2.5 million taka
রাজশাহী প্রতিনিধি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৭ অপরাহ্ন আইন-আদালত
রাজশাহী প্রতিনিধি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৭ অপরাহ্ন
কারুশ্রী জুয়েলার্সের চুরির উদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন ॥ ২৬ ভরি স্বর্ণ ও ২৫ লাখ টাকা উদ্ধারসহ গ্রেফতার ৮
ছবি - বিজয় বাংলা

★চুরি ২০০ ভরি স্বর্ন - উদ্ধার ২৬ ভরি।

★চুরি ২২০০ ভরি রূপা-৬২ ভরি।

 ★৩ বক্স স্বর্ণের নাকফুল - উদ্ধার নাই।

রাজশাহীর সাহেববাজারের আলোচিত কারুশ্রী জুয়েলার্সে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় সাতজন কথিত চোর এবং চোরাই স্বর্ণ কেনার অভিযোগে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। গ্রেপ্তার কৃতদের কাছ থেকে চুরি যাওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে চুরি যাওয়া মালামালের পরিমাণের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মালামালের হিসাবে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন জুয়েলার্সের মালিক। তার  দাবি অনুযায়ী, ওই ঘটনায় প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ২ হাজার ২০০ ভরি রূপা, তিন বক্স স্বর্ণের নাকফুল এবং ২০ লাখ টাকা চুরি হয়েছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ চোরাই মালামালের বাকি অংশ কোথায় গেল—এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আরএমপির মুখপাত্র গাজিউর রহমান সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

তিনি জানান,চার মাস ধরে রেকি, এরপর দেয়াল কেটে চুরি

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি হঠাৎ করে কারুশ্রী জুয়েলার্সকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি। চুরির প্রায় ৪ মাস আগে চোর চক্রের সদস্যরা রাজশাহীতে এসে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করে। ব্যবসার কথা বলে তারা দোকান ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে এবং নিরাপদে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নির্ধারণ করে।

গত ১৯ জুন ভোরে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল সাহেববাজারে কারুশ্রী জুয়েলার্সের সামনে অবস্থান নেয়। তারা বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকান বসিয়ে কৌশলে জটলা তৈরি করে। পরে পাশের একটি স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে।

এরপর ওই দোকানের ভেতর দিয়ে কারুশ্রী জুয়েলার্সের পশ্চিম পাশের দেয়াল কেটে মূল দোকানে ঢোকে চোরেরা। সিন্দুক ভেঙে স্বর্ণ, রূপা, নাকফুল ও নগদ টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তুর্য সরকার বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেন।


প্রযুক্তি ও সিসি ক্যামেরায় শনাক্ত:-

চুরির ঘটনা তদন্তের জন্য মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরের নির্দেশে ডিবি, সাইবার ইউনিট ও সিসি ক্যামেরা ইউনিটের সদস্যরা যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেন।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। পরে রাজশাহী থেকে বেরিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেওয়া সদস্যদের ধরতে একাধিক অভিযান চালানো হয়।

গত  ৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে খুলনা থেকে বাগেরহাটের মোংলা থানার শেহলাবুনিয়া মোর্শেদ সড়ক গ্রামের মো. ফজলুল হকের ছেলে মো. রুস্তম আলী শেখকে (৬৪) গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যদিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা গ্রামের স্বপন (৬২), উজ্জল (৩৭), রিয়াজ ওরফে সুমন ওরফে সুজন ওরফে গেদু (৩৯), বাগেরহাটের শরণখোলার আবু তালেব (৪৫), একই এলাকার মো. কালাম শেখ (৪৮) এবং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার ইউনুসকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়।

চোরাই স্বর্ণ কার কাছে:-

তদন্তের পর পুলিশ জানতে পারে, চুরি করা স্বর্ণের একটি অংশ বিক্রি করা হয়েছে ঢাকার এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে। এরপর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চাঁদপুরের কচুয়া থানার সরকার বাড়ী বড়নীখোলা গ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে রবিউল হাসানকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের দাবি, রবিউলের হেফাজত থেকে চুরি যাওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ ও ৬২ ভরি রূপা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে চোরাই স্বর্ণ বিক্রি র ২৫ লাখ টাকাও উদ্ধার করা হয়।

তবে বাদীর হিসাবে যেখানে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ ও ২ হাজার ২০০ ভরি রূপা চুরি যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২৬ ভরি স্বর্ণ ও ৬২ ভরি রূপা। অর্থাৎ চুরি যাওয়া বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ধাতুর বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশের দাবি, বাকি মালামাল উদ্ধারে অভিযান চলছে।

বছরে এক-দুইটি বড় চুরি:-

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ ও অত্যন্ত সতর্ক চক্রের সদস্য। তারা সাধারণত বছরে এক থেকে দুটি বড় ধরনের চুরি করে। একটি প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করার আগে তিন থেকে চার মাস ধরে তারা ওই এলাকা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি করে।অপরাধের সময় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন একবারের বেশি ব্যবহার না করার কৌশলও তারা অনুসরণ করে। সিমকার্ডও অনেক সময় অন্য ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধিত থাকে। ফলে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধের পর তারা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে।

পুলিশের ভাষ্য, কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল নেওয়া হয়েছিল।

বাকি জড়িতদের খোঁজ চলছে:-

আরএমপি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে চক্রের অন্য সদস্য এবং চুরি যাওয়া অবশিষ্ট মালামালের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে চোরাই স্বর্ণ কেনাবেচার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গ্রেপ্তার আটজনকে বৃহস্পতিবার( ১০ সেপ্টেম্বর) আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কারুশ্রী জুয়েলার্সের চুরির ঘটনায় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ-রূপা ও নগদ টাকা লুট হওয়ার পর এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মালামালের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে চুরি যাওয়া বাকি স্বর্ণ-রূপা কোথায় গেছে, কারা তা কিনেছে বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিল এসব প্রশ্নের উত্তর খুজছে সাধারন মানুষ।