পদ্মার পানি কমছে,দুর্ভোগ কমেনি ॥ পানিবন্দি চরাঞ্চলের মানুষ, বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট

Padma water level is decreasing, but suffering has not decreased
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৩৩ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৩৩ অপরাহ্ন
পদ্মার পানি কমছে,দুর্ভোগ কমেনি ॥  পানিবন্দি চরাঞ্চলের মানুষ, বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট
রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে।

রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে নদীর পানি নামলেও বন্যাকবলিত চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। দক্ষিণ তীরের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিস্তীর্ণ চর এলাকা এখনো প্লাবিত থাকায় অনেক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট। একই সঙ্গে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। ফলে নদীর পানি কমার খবর স্বস্তি আনলেও দুর্গত মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো তার বড় কোনো প্রভাব পড়েনি।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ১৭ দশমিক ২৫ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। রাজশাহী পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার ৮০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মিটারগেজ পাঠক এনামুল হকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২৮ মিটার। বিকেলে তা নেমে হয় ১৭ দশমিক ২৭ মিটার। এরপর বুধবার দুপুরে আরও কমে ১৭ দশমিক ২৫ মিটারে দাঁড়ায়। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, কয়েক দিন বাড়ার পর পদ্মার পানি এখন ধীরে ধীরে কমতির দিকে রয়েছে।

এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি ১৭ দশমিক ৩০ মিটার পর্যন্ত উঠেছিল। ওই সময় দক্ষিণ তীরের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়ে এবং বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

পানি নামছে, কিন্তু ঘরে ফেরার সুযোগ নেই:-

নদীর মূল স্রোতে পানি কমতে শুরু করলেও চরাঞ্চলের নিম্নভূমি থেকে পানি দ্রুত সরে যাচ্ছে না। ফলে কোথাও বসতঘরের চারপাশে পানি, কোথাও চলাচলের পথ পানির নিচে। অনেক পরিবারকে স্বাভাবিক বসতভিটার বাইরে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

চরখিদিরপুর ও খানপুর রাজশাহী শহরের বিপরীত দিকে পদ্মার দক্ষিণ তীরে ভারত সীমান্তঘেঁষা এলাকা। পানি বাড়ার সময় এসব চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বসতবাড়ি, চলাচলের রাস্তা ও কৃষিজমি পানিতে ডুবে যায়।

পানি কমতে শুরু করলেও দুর্গত মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপদ খাবার পানি। দীর্ঘ সময় প্লাবিত থাকার কারণে স্বাভাবিক পানির উৎস ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও খাবার সংগ্রহ করাও দুরূহ হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে:-

চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গবাদিপশুর সম্পর্ক সরাসরি। বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ও উঠান ডুবে যাওয়ায় গরু-ছাগলসহ গবাদিপশু রাখার জায়গা সংকুচিত হয়েছে। খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পানি পুরোপুরি না নামা পর্যন্ত শুধু মানুষের নয়, গবাদিপশুর নিরাপত্তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে। চরাঞ্চলে পানি কমার পরও কাদা, জলাবদ্ধতা ও চলাচলের দুর্ভোগ কিছুদিন থেকে যেতে পারে।

শহর রক্ষা বাঁধ আপাতত ঝুঁকিমুক্ত:-

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মিটারগেজ পাঠক এনামুল হক জানিয়েছেন, রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে বর্তমানে কোনো ঝুঁকি নেই। তবে পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও ঝুঁকির সৃষ্টি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে পানি বাড়ার সময়ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছিল, পানির চাপ বাড়লেও শহর রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে।

ফলে নগরবাসীর জন্য আপাতত বড় ধরনের আতঙ্কের কারণ না থাকলেও নদীর পানি পুরোপুরি স্বাভাবিক পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

পানি কমলেই শেষ হচ্ছে না সংকট:-

বন্যা পরিস্থিতিতে সাধারণত নদীর পানি কমে যাওয়াকে স্বস্তির লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু চরাঞ্চলের ক্ষেত্রে পানি নামার পরও দুর্ভোগ অব্যাহত থাকতে পারে। পানিবন্দি অবস্থায় খাদ্য ও নিরাপদ পানির সংকট, যোগাযোগব্যবস্থার বিঘ্ন, গবাদিপশুর খাদ্যসংকট এবং জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে পানি নামার পরও স্বাভাবিক জীবন ফিরতে সময় লাগে।

স্থানীয়দের দাবি, পানি কমার এই সময়ে দুর্গত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গবাদিপশুর জন্য খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

নজর এখন চরাঞ্চলের মানুষের দিকে:-

রাজশাহীতে পদ্মার পানি এখন বিপৎসীমার নিচে এবং কমতির দিকে। কিন্তু নদীর পানি ও মানুষের দুর্ভোগ—দুটি বিষয়কে একই মাপকাঠিতে দেখার সুযোগ নেই। মূল নদীতে পানি কমলেও নিম্নাঞ্চল ও চর থেকে পানি সরে যেতে সময় লাগে।


তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীর পানি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্লাবিত চরাঞ্চলের মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি নজরদারি করা। কোথায় কত পরিবার এখনো পানিবন্দি, কোথায় নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে এবং কোথায় খাদ্য ও গবাদিপশুর সহায়তা প্রয়োজন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে সহায়তা পৌঁছানো গেলে পানি নামার আগেই মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

পদ্মার পানি কমার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা রয়েছে। তবে চরাঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে নদীর পানি আরও কমার পাশাপাশি বসতভিটা, যোগাযোগপথ ও পানির উৎসগুলোও ব্যবহারযোগ্য হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।