রেলস্টেশনে তাণ্ডবের মধ্যে সরকারি সম্পদ রক্ষায় ঝুঁকি নিলেন রাসিক প্রশাসক রিটন
রাজশাহী রেলস্টেশনে যখন একের পর এক কাচ, দরজা-জানালা, টিকিট কাউন্টার, সিসিটিভি ক্যামেরা ও বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চলছিল, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটনসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েই তারা সরকারি সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজশাহী রেলস্টেশন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ স্টেশনে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এ ঘটনায় স্টেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যাত্রী ও রেলওয়ে কর্মীদের মধ্যে।
তাণ্ডবের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে রিটন:-
ভাঙচুরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন, মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব এমদাদুল হক লিমনসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী রেলস্টেশনে উপস্থিত হন।
তাদের বক্তব্য ছিল—শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; কিন্তু সেই প্রতিবাদের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য নয়।
রিটনসহ নেতারা শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং ভাঙচুর বন্ধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি তখন এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, ভাঙচুর ঠেকানোর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।
‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করেছি-রিটন’:-
ঘটনার পর মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, স্টেশনে ভাঙচুরের খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সঙ্গে সংহতি থাকলেও সরকারি সম্পদ ধ্বংসের বিষয়টি তারা মেনে নিতে পারেননি।
তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে রেলস্টেশন, রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস কিংবা অন্য কোনো সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো হলে তার দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে।
কয়েক ঘণ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনা:-
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষুব্ধরা রাজশাহী রেলস্টেশনের প্রবেশপথের কাচ, টিকিট কাউন্টার, আনসার বক্স, বিশ্রামাগার, ডাস্টবিন, দোকানপাট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষ, সাইনবোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরায় ভাঙচুর চালান। পার্সেল অফিস এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার(২১ সেপ্টেম্বর) সকালে স্টেশনে গিয়ে ভাঙা কাচ সরাতে দেখা যায় কর্মীদের। ভাঙচুরের কারণে স্টেশনের স্বাভাবিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
প্রশ্ন উঠছে সরকারি সম্পদ কার:-
রেলস্টেশনের স্থাপনাগুলো কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়। এগুলো রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য তৈরি সরকারি অবকাঠামো। ফলে কোনো ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে এসব সম্পদ ধ্বংস হলে শেষ পর্যন্ত তার আর্থিক দায় বহন করতে হয় জনগণকেই।
এ কারণেই রেলস্টেশনে সংঘটিত ভাঙচুরের ঘটনায় একদিকে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে; অন্যদিকে সরকারি সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবিও সামনে এসেছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় সন্দেহভাজন চার কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে ভাঙচুরে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
উত্তেজনার মধ্যেও সম্পদ রক্ষার বার্তা:-
রাজশাহী রেলস্টেশনের রাতের ঘটনাটি শুধু একটি শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সরকারি স্থাপনা ও জনসম্পদ রক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
ঘটনার একপর্যায়ে যখন স্টেশন এলাকায় উত্তেজনা চরমে এবং ভাঙচুর চলছিল, তখন রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সরকারি সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। রিটনসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি এবং ভাঙচুর বন্ধের চেষ্টা সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
তবে পুরো ঘটনার দায় নির্ধারণে আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে তদন্তের মাধ্যমে কার কী ভূমিকা ছিল, তা স্পষ্ট করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের সত্যতা যেমন তদন্তে নির্ধারিত হবে, তেমনি রেলস্টেশনে সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও ভাঙচুরে কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে।