রাজশাহীতে বেড়েই চলেছে অপরাধ: ৬ মাসে ১২ খুন, মুদি দোকানিকে কুপিয়ে হত্যা
একসময় দেশের অন্যতম শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে গত দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটেছে।
জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ ও সংঘবদ্ধ হামলার মতো গুরুতর অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে ২০২৫ সালের পর থেকে প্রকাশ্য ছিনতাই, অস্ত্রধারীদের সংঘবদ্ধ হামলা ও একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জননিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে রাজশাহী মহানগরের রাজপাড়া থানার বাকির মোড় এলাকায় আবদুল বারী (৪০) নামে এক মুদি দোকানিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার আগে তার দোকানে পেট্রলবোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই রাজশাহী মহানগরীতে ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ের মধ্যে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) নিয়মিত অভিযান চালালেও অপরাধের গতি থামানো যাচ্ছে না।
নগরে খুনের খতিয়ান:-
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) দেওয়া তথ্য মতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন থানায় ১২টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়। এছাড়া বিগত বছরগুলোতেও একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল।
২০২৫ সালের এপ্রিলে তালাইমারী এলাকায় বখাটেদের ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় আকরাম হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে রাজপাড়া থানার একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামিসহ একাধিক সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
২০২৬ সালের মে মাসে এক অটোরিকশাচালককে হত্যার পর বাহনটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকৃত অটোরিকশাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে আরএমপি।
পেট্রলবোমা ছুড়ে দোকানিকে হত্যা:-
সর্বশেষ ২৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে বাকির মোড়ে নৃশংসতার শিকার হন ব্যবসায়ী আবদুল বারী। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যার পর চণ্ডীপুর এলাকার কয়েকজন যুবক বারীর দোকানে এসে টাকা ভাঙতি চায়। এ নিয়ে তাদের সাথে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। এর জের ধরে গভীর রাতে দেশীয় অস্ত্র ও পেট্রলবোমা নিয়ে ৫০ থেকে ৫৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল দোকানে হামলা চালায়।
হামলাকারীরা প্রথমে দোকানের সাটারের তালা ভেঙে পেট্রলবোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধোঁয়া ও আগুন দেখে বারী ও তার পরিবারের সদস্যরা বের হয়ে এলে অস্ত্রধারীরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানায়, ঘটনার কারণ উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চলছে।
বেপরোয়া ছিনতাইকারী চক্র:-
রাজশাহী মহানগরে ছিনতাইয়ের উপদ্রব প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২১টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল আরএমপি। একই সময়ে জেলা এলাকায় আরও ৭টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে বোয়ালিয়া থানার ঘোড়ামারা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর ম্যানেজারের চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয়। নভেম্বরে শিরোইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা যাত্রীর কাছ থেকে বার্মিজ চাকুর মুখে সর্বস্ব লুটে নেয় ছিনতাইকারীরা।
এছাড়া ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্টে পবা ও শাহ মখদুম থানা এলাকায় রিকশাচালক ও পথচারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
উপজেলায় অপরাধের থাবা:-
মহানগরের বাইরে জেলার বাগমারা, তানোর, পবা, গোদাগাধী ও দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ এবং জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে সহিংসতার হার বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জেলায় ৬টি হত্যা, ৪টি হত্যাচেষ্টা, ১৭টি ধর্ষণ, ২টিতে গণধর্ষণ, ৬টি ধর্ষণচেষ্টা, ১টি ধর্ষণের পর হত্যা এবং ৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। এছাড়া জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উক্ত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৭টি ছিনতাই ও ৭টি ডাকাতির মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বদলেছে অপরাধের ধরন:-
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজশাহীতে অপরাধের ধরন ও মাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অতীতে যেখানে চুরি, মাদক বা পারিবারিক কলহকেন্দ্রিক অপরাধ বেশি ঘটত; বর্তমানে সেখানে যুক্ত হয়েছে প্রকাশ্য ছিনতাই, সংঘবদ্ধ হামলা, আগ্নেয়াস্ত্র ও পেট্রলবোমার ব্যবহার।
মহানগর ও জেলা পুলিশের নিয়মিত অভিযানে গ্রেপ্তারের খতিয়ান থাকলেও থামছে না অপরাধের চাকা। বিশেষ করে বাকির মোড়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর রাতে পেট্রলবোমা মেরে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা পুরো নগরবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ ও মামলার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই জনমনে স্বাভাবিক আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।