মাদকের অভিযানে ‘নগদ ১০’, পরে ‘শপথে ৪০’—এএসআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ

'Nagad 10' in drug operation
প্রতিনিধি, বদলগাছী (নওগাঁ): ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪২ অপরাহ্ন সারা বাংলা
প্রতিনিধি, বদলগাছী (নওগাঁ): ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪২ অপরাহ্ন
মাদকের অভিযানে ‘নগদ ১০’, পরে ‘শপথে ৪০’—এএসআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নওগাঁর বদলগাছীতে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় এক নারীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া এবং আরও ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য তাঁর প্রতিবন্ধী ছেলের মাথায় হাত রেখে শপথ করানোর অভিযোগ উঠেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা।

অভিযোগের তীর নওগাঁ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এএসআই মো. আব্দুল মোমিনের দিকে।

ঘটনাটি গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) উপজেলার মিঠাপুর ইউনিয়নের জগপাড়া গ্রামে ঘটে বলে অভিযোগকারী শ্রীমতি স্মৃতি জানান। তিনি ওই গ্রামের মৃত বিমল মন্ডলের ছেলে সঞ্জয় কুমার মন্ডলের স্ত্রী।

ওই অভিযানে মাদক পাওয়ার অভিযোগে সঞ্জয় কুমার মন্ডল (৪২) ও বিকাশ মন্ডল (৪০) নামের দুজনকে আটক করা হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনির ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউএনও ইসরাত জাহান ছনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা ওই দুজনকে নিয়ে আসেন। তাদের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। তবে টাকা নেওয়া বা ঘুষের অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আমার জানা নেই। মোবাইল কোর্টে এমন প্রশ্নই আসে না। তারপরও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এএসআই মোমিনের বিরুদ্ধে কী করা যায়, তা দেখব।

অভিযোগকারী স্মৃতি বলেন, গত ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে নওগাঁ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৪-৫ জনের একটি দল তাঁদের বাড়িতে আসে। তাঁর স্বামীকে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে বাড়িতে তল্লাশি করা হয়। তিনি স্বামী মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত নন বলে জানালে একপর্যায়ে এএসআই আব্দুল মোমিন তাঁর স্বামীকে প্রতিবন্ধী ছেলের সামনে দুইটি চড় মারেন বলে অভিযোগ করেন।

স্মৃতির দাবি, তাঁর স্বামী হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। স্বামীকে মারধরের দৃশ্য দেখে তাঁর বড় মেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বামীকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না পাওয়ার জন্য তাঁর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। বাড়িতে এত টাকা নেই জানালে স্বামীকে মামলায় জড়ানোর ও মারধরের ভয় দেখানো হয়। পরে প্রতিবন্ধী ছেলের চিকিৎসার জন্য রাখা ১০ হাজার টাকা তিনি দেন বলে দাবি করেন।

স্মৃতির আরও অভিযোগ, পরে আরও ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। টাকা না দিলে তাঁকেও মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়। একপর্যায়ে প্রতিবন্ধী ছেলের মাথায় হাত রেখে আরও ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য তাঁকে শপথ করানো হয়। এ সময় এএসআই মোমিন তাঁকে একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে নওগাঁয় টাকা নিয়ে যেতে বলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে, প্রতিবেদকের কাছে আসা ৪৩ সেকেন্ডের একটি কল রেকর্ডে এক নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘কালকে জোগাড় করতে পারিনি।’ অপরপ্রান্ত থেকে তাঁকে ‘আপনি কোথায় আছেন, অফিসে আসবেন আজকে?’—এমন কথা বলতে শোনা যায়। ওই নারী জানান, তিনি জেলগেটে গিয়েছিলেন এবং তাঁর স্বামী তাঁর সঙ্গে ‘চাওয়া-পাওয়ার যা আছে’ তা দিতে বলেছেন। পরে অপরপ্রান্ত থেকে তাঁকে অফিসে আসতে বলা হয়। তবে ওই রেকর্ডের অপরপ্রান্তের ব্যক্তির পরিচয় ও কথোপকথনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারী আরও বলেন, তাঁদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বিকাশ নামের একজনকে গাঁজাসহ আটক করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। পরে তাঁর স্বামীর কাছে জানতে পারেন, বিকাশের কাছ থেকে পাওয়া গাঁজা দুজনের নামে দেখানো হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এএসআই মো. আব্দুল মোমিন। তিনি বলেন, আমরা বিকাশ ও সঞ্জয় নামের দুইজনকে ধরেছি। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ইউএনও স্যার তাদের তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ওই নারীর সঙ্গে টাকার বিষয়ে আমার কোনো কথা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই আমার মোবাইল নম্বরে ফোন করেন। ওই নারীও গতকাল ফোন করেছিলেন। প্রায় ৩০ সেকেন্ড কথা হয়েছে। আমার কল লিস্ট দেখা যেতে পারে। তাঁর সঙ্গে টাকার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। বরং ওই নারীই আমাকে ফাঁসানোর জন্য ফোন করে থাকতে পারেন। তাঁর টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।’

নওগাঁ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, এ ধরনের ঘটনা আমার জানা নেই। আপনার মুখেই প্রথম শুনলাম। তবে তারা মাদকের সঙ্গে জড়িত—এটা আমি জানি। সে কারণেই তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে দেওয়া হয়েছে। অভিযানের দলে পরিদর্শক সাইফুল আলম ছিলেন বলেও তিনি জানান।

পরিদর্শক সাইফুল আলম অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ওই দিন তাঁরা একসঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়েছিলেন। তবে একাধিক বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করায় তাঁরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যান। সঞ্জয়ের বাড়িতে তিনি নিজে যাননি বলে জানান। ফলে সেখানে কী ঘটেছে, তা তাঁর পক্ষে বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।