উত্তরবঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতিঃ রামেকে এক মাসেই ১২ মৃত্যু, বাড়ছে 'শক সিন্ড্রোম' ও হৃদরোগের ঝুঁকি

Dengue situation worsens in North Bengal
আবুল কালাম আজাদ ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৫৮ অপরাহ্ন স্বাস্থ্য
আবুল কালাম আজাদ ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৫৮ অপরাহ্ন
উত্তরবঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতিঃ  রামেকে এক মাসেই ১২ মৃত্যু, বাড়ছে 'শক সিন্ড্রোম' ও হৃদরোগের ঝুঁকি
--সংগৃহীত ছবি

রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে সাধারণ জ্বর নিয়ে আসা আক্রান্তদের একটি বড় অংশের শারীরিক অবস্থা দ্রুত জটিল রূপ নিচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্লাটিলেট হ্রাসের সনাতন লক্ষণের চেয়ে এবার আশঙ্কাজনক হারে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ (ডিএসএস) এবং হৃদযন্ত্রের প্রদাহজনিত জটিলতা ‘মায়োকার্ডাইটিস’।


​হাসপাতালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন ৩৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন এবং সমসংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। 


আর বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১১০ জন রোগী। এর বিপরীতে নির্ধারিত ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৪৫টি। রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে চলতি সপ্তাহেই ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে আরও ৬০টি শয্যা সংযোজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন।

​রামেক হাসপাতালের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের ৭ জুন থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮৭২ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন। 


কোভিডের পর এবার ডেঙ্গুতে প্রাণহানির ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫ জন, কুষ্টিয়ার ২ জন এবং পাবনা, নাটোর ও ঝিনাইদহের ১ জন করে রয়েছেন।


​সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে গত এক মাসের পরিসংখ্যানে। ৩১ আগস্ট থেকে ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যে ১২ জন মারা গেছেন, তাদের ১১ জনেরই প্রাণহানি ঘটেছে 'ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে'। এর মধ্যে গত ২৬ সেপ্টেম্বর বাঘা উপজেলার চার বছর বয়সী শিশু মাইশা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম নিয়ে ভর্তির মাত্র দুই দিনের মাথায় মারা যায়।


​বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেওয়া এবং অসচেতনতাই মৃত্যুর মূল কারণ। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফ.এ.এম. আঞ্জুমান আরা বেগম জানান, সাধারণ জ্বর মনে করে ঘরে অবস্থান করায় রোগীরা শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসছেন। ফলে ততোক্ষণে 'শক সিন্ড্রোম' বা 'মায়োকার্ডাইটিস'-এর মতো জটিলতা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। জ্বর অনুভব করার সাথে সাথেই এনএস-১ (NS1) পরীক্ষা করানো এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।


​এদিকে অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালে তীব্র শয্যা ও নার্স সংকট দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি অনেক জরুরি সরবরাহকৃত ওষুধ হাসপাতালে না পাওয়ায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরের ফার্মেসি থেকে চড়া দামে তা কিনতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী স্বজনরা অভিযোগ তুলেছেন।


​পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে জনসচেতনতার জোর তাগিদ দিয়েছেন জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা। সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার জানান, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।


​অন্যদিকে সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, জেলার ৯টি উপজেলার ৭৮টি চিহ্নিত স্থানে প্রতি শনিবার একযোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।