মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভারে রাত নামলেই অপরাধের অভয়ারণ্য : অন্ধকারে ম্লান নগর নিরাপত্তা

আবুল কালাম আজাদ ​বিশেষ প্রতিনিধি:- ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৩৮ অপরাহ্ন সারা বাংলা
আবুল কালাম আজাদ ​বিশেষ প্রতিনিধি:- ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৩৮ অপরাহ্ন
মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভারে রাত নামলেই অপরাধের অভয়ারণ্য : অন্ধকারে ম্লান নগর নিরাপত্তা
রাজশাহী মহানগরীর পূর্বে ব্যস্ততম সড়ক সংযোগ মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভার।

রাজশাহী মহানগরীর পূর্বে ব্যস্ততম সড়ক সংযোগ মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভার। খড়খড়ি, বাইপাস, বুধপাড়া এবং মেহরচন্ডি এলাকার বাসিন্দাদের নগরীতে প্রবেশের একমাত্র পথ। প্রধান এই সংক্ষিপ্ত পথটি দিয়ে প্রতিদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার পথচারী চলাচল করেন। কিন্তু দিনের আলো নিভতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ব্যস্ত যোগাযোগমাধ্যমটি মুহূর্তেই পরিণত হয় মাদক সেবন, বিক্রি ও অসামাজিক কার্যকলাপের উর্বর ভূমিতে। 

সরেজমিনে অনুসন্থানে উঠে এসেছে পর্যাপ্ত আলোর অভাব, ভৌগোলিক নির্জনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঢিলেঢালা নজরদারির সুযোগে কীভাবে এলাকাটি ক্রমান্বয়ে অপরাধের স্থায়ী আস্তানায় রূপ নিচ্ছে।

​ভৌগোলিক সুযোগ ও অবকাঠামোগত গলদ:-

ফ্লাইওভারের ঠিক নিচে ও সংলগ্ন ভদ্রা-জামালপুর গ্রামের কাছে রয়েছে একটি মাজার এবং বিস্তীর্ণ ঝোপঝাড় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ফাঁকা জায়গা। রাতের অন্ধকারে এখানে অচেনা মানুষের সন্দেহজনক আনাগোনা নিত্যদিনের ঘটনা। 

স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ফ্লাইওভারের নিচের অন্ধকারে প্রতিনিয়ত বসছে মাদকের হাট,এমনকি ভ্রাম্যমান মাদক বিক্রেতা ও মাদক সেবিদের আনাগোনা । 

ফ্লাইবারের নিচে, আশেপাশে, এমনকি ফ্লাইওভার এর উপরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় ফেনসিডিল-মদের বোতল, সিরিঞ্জ ও ব্যবহৃত কনডম।

 শুধু মাদক নয়, মোটরসাইকেল নিয়ে বহিরাগত তরুণদের বেপরোয়া গতি, টিকটক আড্ডা এবং প্রকাশ্য আপত্তিকর আচরণের কারণে সংলগ্ন এলাকার সামাজিক পরিবেশ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

​ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা:- আলটিমেটাম ও চার দফা দাবি

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চরম ভোগান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে এবার সোচ্চার হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী ও একা চলাচলকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চার দফা জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

​চন্দ্রিমা ও বোয়ালিয়া থানার যৌথ উদ্যোগে অবিলম্বে ফ্লাইওভারের ওপর ও নিচে নিয়মিত নাইট পেট্রোলিং এবং স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন। অবকাঠামোগত পরিবর্তন: ফ্লাইওভারের নিচ ও আশপাশের সমস্ত ঝোপঝাড় অবিলম্বে পরিষ্কার করা এবং অকেজো বাতি সংস্কার করে হাই-ভোল্টেজ ‘এলইডি লাইট’ স্থাপন। মাজার সংলগ্ন ফাঁকা জায়গা ও নির্জন পকেটগুলোকে ‘ক্রাইম জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে সিআইডি বা ডিবি-র গোপন নজরদারি বাড়ানো এবং স্পট-রেইড চালনা। সোশ্যাল অডিট ও সিসিটিভি স্থাপন করে নগর কর্তৃপক্ষের (আরসিসি) উদ্যোগে সমগ্র ফ্লাইওভার এলাকাকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা।

​ভদ্রা-জামালপুর এলাকার সাংবাদিক মতিউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভারটি কোনো পরিত্যক্ত সড়ক নয়, এটি রাজশাহীর একটি ভাইটাল কানেক্টিভিটি। কিন্তু পর্যাপ্ত আলোর অভাব ও প্রশাসনের উদাসীনতায় এটি অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। আমরা শুধু মৌখিক আশ্বাস চাই না, দৃশ্যমান যৌথ অভিযান চাই।"

​মেহেরচণ্ডী এলাকার বাসিন্দা আল মামুন সতর্ক করে বলেন, "রাতের বেলায় আমাদের ঘরের মেয়ে-বোনেরা তো দূরে থাক, সাধারণ পথচারীরাও একা যেতে ভয় পান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ঝুঁকিতে পড়ছেন। 

ভদ্রা মোড় এর ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, এটি শুধু মাদকের বিষয় নয়, যেকোনো সময় এখানে বড় ধরনের ছিনতাই বা নারী নির্যাতনের মতো নৃশংস অপরাধ কয়েকবার সংঘটিত হয়েছে। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না দিলে বা কালক্ষেপণ করলে আমরা নাগরিক কমিটি গঠন করে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।"

অন্যদিকে, ​অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও গভীর। সন্তানদের গৃহশিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষে বাড়ি ফেরা নিয়ে প্রতি রাতে শঙ্কায় থাকতে হয় বলে জানান  বেশ কয়েকজন অভিভাবক।

​পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ: কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও কঠোর হুঁশিয়ারি

​ফ্লাইওভারটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অপরাধচক্র ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও মিডিয়া সেল কর্মকর্তা গাজিউর রহমান বলেন, পুলিশ অপরাধের বিষয়টিকে কেবল 'সাধারণ আড্ডা' হিসেবে দেখছে না বরং এর পেছনে থাকা ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত কারণগুলো বিশ্লেষণ করছে।

আরএমপি মুখপাত্র বলেন, "মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভারের স্থানটি বেশ কিছু কারণে অপরাধীদের কাছে নিরাপদ মনে হয়। প্রথমত, এটি একাধিক থিয়েটার বা থানার সীমান্ত সংলগ্ন এবং ফ্লাইওভারের নিচের বিস্তৃত এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ঝোপঝাড়ে ঢাকা। এ ধরনের 'ব্লাইন্ড স্পট' বা নির্জন পকেটগুলো সাধারণত ভাসমান অপরাধী ও মাদকসেবীদের আকৃষ্ট করে। পর্যাপ্ত লাইটিং না থাকাটা অপরাধীদের বড় সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।"

পুলিশের নতুন কৌশলগত পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শুধু প্রথাগত টহল নয়, মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভারের রাতের নিরাপত্তা জোরদারে একটি সমন্বিত প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন রাতে ঝটিকা অভিযান (Flash Raids) চালানো হয়। এছাড়া সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে, যাতে অপরাধের উৎস এবং এর পেছনের মাদক সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করা যায়।"


নগর অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, "পুলিশি টহল দিয়ে সাময়িক সমাধান সম্ভব, তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। আমরা ইতিমধ্যে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (আরসিসি) ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে অতি দ্রুত ফ্লাইওভারের নিচের অন্ধকার দূর করতে হাই-পাওয়ার লাইট বসানো হয় এবং ঝোপঝাড়গুলো কেটে উন্মুক্ত করা হয়।"


রাজশাহী মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি যোগ করেন, "মাদক ব্যবসা, সেবন কিংবা অসামাজিক কাজের ক্ষেত্রে আরএমপির অবস্থান 'জিরো টলারেন্স'। আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী বা অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের সর্বোচ্চ ধারায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অনুরোধ, কোনো তথ্য বা সন্দেহভাজন গতিবিধি নজরকাড়লে তাৎক্ষণিক ট্রিপল নাইন (৯৯৯) বা স্থানীয় থানায় অবহিত করুন।"

​

রাজশাহী নগরীর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ এভাবে অপরাধীদের দখলে চলে যাওয়া কেবল স্থানীয়দের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক নগর নিরাপত্তার জন্যই এক বড় হুমকি। পুলিশের আশ্বাস ও স্থানীয়দের যৌক্তিক দাবির মুখে এখন দেখার বিষয়—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঠিক কত দ্রুত এই 'ব্ল্যাক স্পট'-কে একটি নিরাপদ চলাচলের পথে রূপান্তরিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।