বিষণ্ন ও হতাশ হয়ে শয়তানকে জিতিয়ে দেবেন না
আমি বিষণ্ণ হব না, কারণ ড. ক্লেয়ার যেমনটা বলেছেন, এই আত্মধ্বংসী দুনিয়া নিয়ে শোক করে কোনো লাভ নেই। এতে শুধু ভুক্তভোগীর সংখ্যা আর শয়তানের জয়টাই বাড়ে। আর এটাই সত্য। এ সুযোগ শয়তানকে দেবেন না। সে তো চায় সবাই যেন সব সময় হতাশ আর অন্ধকারে থাকে।
শয়তান মানুষকে অবসেসিভ বা আচ্ছন্ন চিন্তার মধ্যে ফেলে দিতে চায়, সে মানুষের ওপর এক ধরনের নিরন্তর হামলা চালায়। মানুষ তো এমন এক জাতি যাদের মূল ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর ওপর ভরসা।
নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও নিম্নতম সময়েও আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তা পেয়েছিলেন যে, যতক্ষণ আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট নন, ততক্ষণ বাকি কোনো কিছুতেই আমার কিছু যায় আসে না। আর দুনিয়ায় যা ঘটার, তা তো ঘটবেই; এর বিরুদ্ধে আমাদের করার কিছু নেই। সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো কঠিন পরিস্থিতির জন্য নিজের ইমানকে প্রস্তুত রাখা। কারণ এই দুনিয়ায় কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আসে।
দুনিয়ায় যখন কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর কঠিন সংকট নেমে আসে, তখন জেনে রাখুন এর পরেই কোনো না কোনো স্বস্তি আসবে। দুনিয়া এভাবেই চলে; কষ্ট আর স্বস্তি মিলেমিশে। তাই এই দুনিয়ার সব কষ্ট আর গণমাধ্যমের নেতিবাচক খবরগুলো নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া ঠিক নয়। মানুষের মন একসঙ্গে সারা বিশ্বের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ধারণ করার জন্য তৈরি হয়নি। আপনার নিজের পরিবার ও চারপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যেই তো যথেষ্ট সংকট রয়েছে। সেবা করার মতো অসুস্থ মানুষ, বিধবা আর এতিম তো আমাদের আশপাশেই আছে। কিন্তু আপনি যদি সারা বিশ্বের সমস্ত বিচার ও ট্র্যাজেডি নিজের ওপর চাপিয়ে নেন, তবে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
ড. ক্লেয়ারের সেই আরবি শব্দটির অনুবাদ নিয়েও কথা হয় যেটিকে তিনি ‘শয়তান’ বা ‘প্রতারক’ না বলে ‘অবসেসর’ বা ‘যিনি মনে কুমন্ত্রণা বা আচ্ছন্নতা সৃষ্টি করেন’ হিসেবে অনুবাদ করেছেন। শয়তান মানুষের মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে মানুষ অতিরিক্ত চিন্তা আর অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়।
যেমনটা একটি কবিতায় বলা হয়েছে, আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ভাঙা মন নিয়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষের কথা। সে সমস্ত শয়তানকে সঙ্গে নিয়ে রাতের পর রাত প্রার্থনা করে বেড়ায়, কিন্তু অন্ধকার ছায়ায় মগ্ন থাকায় সে আর রহমত বা শান্তির নাগাল পায় না। সে তার ভেতরের সৎ সত্তা বা ভালো প্রেরণাগুলোকে বিসর্জন দিয়েছে। এভাবেই তো বড় বড় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অতিরিক্ত অহংকার, সীমালঙ্ঘন এবং নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে আত্মম্ভরিতাই সাম্রাজ্যের ধ্বংস ডেকে আনে।
রোমান সাম্রাজ্যের পতন কিংবা আজকের আধুনিক সমাজের অবক্ষয়—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একই কারণ। যখন সমাজ থেকে ধর্ম ও নৈতিকতার দৃষ্টি হারিয়ে যায়, তখন মানুষের ভেতরের পবিত্রতা ও সরলতা নষ্ট হয়ে যায়। পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, মানুষ স্বার্থপর হয়ে ওঠে এবং সমাজে নিষ্ঠুরতা জেঁকে বসে। ব্যাংক ও সুদভিত্তিক ব্যবস্থা মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়, আর মানুষ তখন শুধু নিজের চাকরি বাঁচানোর অজুহাতে অন্যায় দেখেও মুখ ফিরিয়ে থাকে। মানুষ তখন নিজেকেই সবকিছুর দাতা বা নিয়ন্তা ভাবতে শুরু করে, যা এক ধরনের চরম আত্মকেন্দ্রিকতা।
তবে এর বিপরীতে আমাদের সমাজে এখনও অনেক ভালো মানুষ ও সুন্দর সম্প্রদায় বেঁচে আছে। যখন মানুষের জীবনে কোনো উপায় থাকে না এবং সে সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে, তখন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত হয়ে দেখা দেয়। কারণ তখন সে আর নিজের সামর্থ্য বা বুদ্ধির অহংকার করতে পারে না; সে পুরোপুরি বুঝতে পারে যে আসল ক্ষমতা কেবল আল্লাহর হাতেই। মানুষ যখন নিজের শর্তে বাঁচতে চায় এবং পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা না রেখে নিজেরাও নিজেদের ভেতরের পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়, তখন অবস্থার কোনো বদল হয় না।
আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, কোনো জাতির অবস্থা তিনি ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভেতরের অবস্থার পরিবর্তন করে। অথচ আমরা উল্টোটা চাই; নিজেকে ঠিক না করেই বাইরের পরিস্থিতি বদলাতে চাই, যা কখনোই সম্ভব নয়।
মানুষের সমালোচনা করা কিংবা গিবত করা হলো শক্তিহীন ও পরশ্রীকাতর মানুষের কাজ। যারা নিজেরা সৎ পথে চলার চেষ্টা করে না, তারাই কেবল অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়। আমি এমন মানুষের কথাও জানি যারা নিজেরা ত্রুটিমুক্ত না হয়েও কেবল অন্যের দোষ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নানা বিপদে জড়িয়ে পড়েছিল। আবার এমন মানুষও দেখেছি যাদের ভুলত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যের দোষ চর্চা থেকে দূরে থাকায় আল্লাহ তাদের ত্রুটিগুলো ঢেকে দিয়েছিলেন।
আমাদের উচিত অকারণে বড় বড় বৈশ্বিক দুশ্চিন্তায় না ভুগে নিজের চারপাশের মানুষের উপকারে মন দেওয়া। আল্লাহ আপনার কাছে দুনিয়ার সব মানুষের দায়িত্ব চাননি, তিনি কেবল বলেছেন আপনার সাধ্যমতো নিকটজন বা এক-দুটি মানুষের পাশে দাঁড়াতে। কাউকে একটু সাহায্য করা, কোনো বিধবা বা এতিমের খোঁজ নেওয়া এটাই আসল কাজ।
এই শেষ জমানায় এসে রক্তপাত বা হিংস্রতা থেকে দূরে থাকাটাই সবচেয়ে বড় বিচক্ষণতা। ইসলামের ইতিহাসের মহান দিনগুলোর কথা স্মরণ করলে দেখা যায় বদরের যুদ্ধের সেই বীরেরা জীবনের সর্বোচ্চ উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু সেনেগালের মহান সাধক আহমাদ বাম্বা স্বপ্নে নবীজির সাক্ষাতের পর এই শিক্ষা পেয়েছিলেন যে, এই উম্মতের জন্য এখন আর রক্তপাতের সময় নেই। তিনি রক্তপাত থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিয়েছিলেন। বর্তমান এই যুগে যারা কোনো না কোনোভাবে রক্তপাত ও সহিংসতার ইন্ধন জোগানো থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে, বিচার দিবসে তাদের হিসাব অনেক সহজ হবে।
সবশেষে কথা একটাই, পরিবেশ ও পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, মানুষের উচিত নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার ও রাগ সংবরণ করা এবং ছোট ছোট সৎ কাজের মাধ্যমে নিজের জীবনকে অর্থবহ করে তোলা।
সূত্র: Islamic Guidance Official